বাংলাসাহিত্য.অনলাইন

"বাংলা গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রকাশ ও আলোচনা"

Breaking

Today's best officer

সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৮

হঠাৎ বৃষ্টি

হঠাৎ বৃষ্টি

বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


এখানের বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও যেন প্রাণে ভরপুর। গাছের সবুজ পাতায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরই হাওয়ার তরঙ্গে হারিয়ে যেতে চায়। দীপক চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে অনুভব করে। ফোঁটাগুলো দীপকের ভেতর পর্যন্ত ছুঁয়ে যায়। কিছু কিছু কষ্ট বৃষ্টির জলে ভেসে যায় সুবর্ণরেখা নদীর দিকে। কিছু কষ্ট বৃষ্টির জলে ধোয়া হয়ে চকচক করে চোখে।
সম্পর্কের হালকা পালকগুলো খসতে খসতে যখন শরীরটায় কুঁকড়ে যাওয়া চামড়া ছাড়া কিছুই ছিল না, তখন এই হাতিবাড়িতে এসেছিল দীপক। এখানের প্রকৃতি ওকে আর ফিরতে দেয়নি। হাতিবাড়ি ফরেস্ট রেস্ট হাউসে মেনেজারির একটা কাজ পেয়ে গিয়েছিল ও। প্রথম প্রথম জীবনের দগদগে দিনগুলো চোখে ভিড় করে আসত। এখন এখানের সবুজে অতীত অনেকটা ম্লান হয়ে এসেছে...
[এক]
আজ সকাল থেকেই রিমঝিম রিমঝিম বৃষ্টি। টুরিস্ট আসার কোনও সম্ভাবনা নেই জেনেই বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়ে দীপক। সোঁদা মাটি আর ভেজা পাতার গন্ধে পুরো পরিবেশটাই এখন নেশা নেশা। কাছে-পিঠেই হয়তো কোথাও অর্কিড ঝুলছে। বনফুলের বুনোগন্ধ বাতাসে। পায়ে পায়ে দীপক সেই ভাঙা মাটির ঘরটায় এসে বসে। এই ঘরটায় কয়েক বছর আগে এক সাঁওতাল পরিবার ছিল। কেন যেন ওরা পালিয়ে গেছে। বেঁচে আছে ঘরটার আনাচে কানাচে ছোট বাচ্চার হাতে আঁকা কয়েকটা ফুলের ছবি। এই ঘরটায় এলে দীপকের অন্যরকম একটা শান্তি লাগে। বাবার মুখটা মনে পড়ে। মায়ের মুখ মনে নেই দীপকের। ও তখন অনেক ছোট। তবে জোড় ধারের শ্মশান থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার ছবিটা এখনো মনে আছে ওর। ওটা কেন মনে আছে দীপক নিজেও জানে না।
হঠাৎ একটা শব্দে চমক ভাঙে দীপকের। সেই ময়ূর দুটো আজকেও এসেছে। প্রথম প্রথম ওরা ভয় পেতো দীপককে। এখন ওরা দীপকের খুব কাছ দিয়ে ঘুরঘুর করে। ঘাসের ভেতর থেকে কিসব যেন খুঁটে খুঁটে খায়।

‘দীপক দাদা... ও দী-প-ক দাদা...’ পিক্লুর ডাক ভেসে আসে দীপকের কানে। ময়ূর দুটো বার কয়েক এদিক সেদিক তাকিয়ে উড়ে যায় সুবর্ণরেখার দিকে। এই পিক্লু পাশের গ্রামের সাঁওতাল ছেলে। ওর বাপ মা কেউই নেই। দেড় বছরের পিক্লুকে ফেলেই ওর মা ভেগেছিল ওর কাকার সঙ্গে। বছর তিনেক হল ওর বাপটা বিষ খেয়ে মরেছে। সেই থেকে ছেলেটা এই গেস্ট হাউসে। ঝাঁটপাট দেওয়া,  রুমে রুমে খাবার পৌঁছানো আর টুরিস্টদেরকে নিয়ে এদিক সেদিক ঘুরতে যাওয়াই পিক্লুর কাজ। যদিও পিক্লু এর বাইরেও বেশ কিছু কাজ করে তবে সেগুলোর জন্য ওর কোনও বেতন নেই।
‘আমি জানতাম তুমি এখানেই থাকবে। তাই সোজা এখানেই এলাম। এসেছে এসেছে...’ জোরে জোরে শ্বাস নেয় পিক্লু। ছুটে আসার ক্লান্তি ওর চোখে মুখে।
‘এই জলে জলে গেস্ট !’
‘সেই যে সেদিন বিকেলে বাজারে তোমাকে অডিটেড বলেছিল...’
‘অডিটেড নয় ইডিয়... চুপকর। ও কী জন্যে এসেছে এখানে।’
‘সঙ্গে আরও দুজন। একটা মেয়ে আর একটা লোক। আমার মনে হয় এরাও সেই ছেলে মেয়েটার মতোই...’
‘চুপকর। বলেছি না তোর ইঁচড় পাকা মাথা নিয়ে কোনও কিছু মনে করার চেষ্টা করবি না। যা ওদেরকে বলে দিবি যা রুম খালি নেই।’
‘সেটা তুমিই গিয়ে বলো। ওরা বলছে ওদের অন্য লাইন বুকিং।’
‘অন্য লাইন দিয়ে এখানে বুকিং হয় না বলে দিবি যা।’
‘কেন ? ওই কলকাতার বাবুটাও তো অন্য লাইন বুকিং করেছিল।’ কথাটা বলে আঙুল দিয়ে মাথার জল ঝাড়ে পিক্লু।
‘ওহ গড , ওটাকে অন্য লাইন বলে নারে গাধা ওটাকে অন লাইন বলে। চল দেখি এদের বুকিংটাই পরিনিতা চ্যাটার্জীর নামেরটা কি না...’
[দুই]
‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেবো বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো,...’
                                                     - হঠাৎ রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর কানে আসতেই ঘুমটা ভেঙে যায় দীপকের। ওর রুমটা গেট হাউসের দোতলার এক্কেবারে কোনায়। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে দীপক। মেঘলা আকাশ কেটে আকাশমণি গাছের ফাঁকে একফালি চাঁদ হাসছে এখন। চাঁদটার থেকে চোখ সরাতেই চোখ পড়ে ছাদের উপর। ওখানে একলা দাঁড়িয়ে গান গাইছে মেয়েটা। চাঁদের ঝাপসা আলোতেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে ওকে।
বাজারে এই মেয়েটাই সেদিন অপমান করেছিল দীপককে। সাইকেলের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে দীপক পড়েছিল ওর পিঠের উপর। দীপকের দোষ ছিল না। তবুও যা মুখে এসেছিল তাই বলেছিল মেয়েটা। অচেনা অজানা বন্ধু-বান্ধবহীন জায়গায় দাঁড়িয়ে দীপক চুপচাপ শুনেছিল। পিক্লু হাঁ করে দেখেছিল।
সেদিনের পর মেয়েটার মুখটা মনে এলেই রাগে শরীরটা রিরি করত দীপকের। আজকে কিছু বলার উপায় নেই। মেয়েটা আর ওর দিদি জামাইবাবু গেস্ট হাউসে তিন দিনের অতিথি। আজকে যদিও সেদিনের সেই বাজারে দেখা মেয়েটার সঙ্গে এই মেয়েটার যেন কোনও মিল নেই। কোথায় যেন দীপকের মতোই সব ভেসে যাওয়া সুরে গাইছে ও,-
‘নতুন নামে ডাকবে মোরে, বাধবে নতুন বাহু-ডোরে,
আসব যাব চিরদিনের সেই আমি,
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।’
                                                                                 -পায়ে পায়ে ছাদে উঠে আসে দীপক। কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে পিছন থেকে ডাক দেয়, ‘এই যে শুনছেন ? রাত্রি দশটার পর ছাদে আসা নিষেধ আছে। নিজের ঘরে চলুন।’
এবার পিছন ফিরে তাকায় মেয়েটা। হাসি হাসি মুখে টলতে টলতে কয়েক পা দীপকের দিকে এগিয়ে এসে বলে, ‘নিজের ঘর ? মেয়েদের নিজের ঘর বলে কিছুই হয় না মশায়। নিজের ঘর কেন, নিজের বলেও কিছুই হয় না...’ দীপকের সামনে দাঁড়িয়ে আবার খিলখিল করে হাসে মেয়েটা। একটা উগ্র ঝাঁঝালো গন্ধ দীপকের নাকে-মুখে এসে ধাক্কা মারে।
‘আপনি ড্রিঙ্ক করেছেন! এখানে কিন্তু ড্রিঙ্ক করা...’
‘বিশ্বাস করুন আমার নেশা হয়নি। আসলে আমার ঘুমোতে ভয় হয় জানেন। চোখ বন্ধ করলেই কেমন যেন সব দুঃস্বপ্ন দেখি। তাই আমি যতক্ষণ সম্ভব জেগেই থাকি।’
‘এখন অনেক রাত হয়েছে। এবার শুয়ে পড়লে ঠিক ঘুমিয়ে পড়বেন।’
‘ওটাই তো চাইছি না আমি।’
‘দেখুন এখানের একটা নিয়ম আছে, তাছাড়া এটা জঙ্গল এলাকা। সিকিউরিটিও মেন গেটের বাইরে থাকে। আমি আপনাকে ছাদে থাকার অনুমতি দিতে পারি না।’
‘আপনিও বসুন না কিছুক্ষণ। ওই চাঁদটার দিকে তাকান, দেখুন ভাল লাগবে।’
‘প্লিজ আপনি নিজের রুমে চলুন। রুমের জানালা খুলে দিলে আপনি চাঁদ দেখতে পাবেন।’ বেশ বিরক্ত হয়েই এবার কথাগুলো বলে দীপক।
‘সেদিন বাজারে আপনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলাম বলেই... আচ্ছা সেদিনের জন্য সরি বলছি। প্লিজ এবার তো আমাকে ছাদে থাকতে দিন।’
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীপক। তারপর ছাদের একটা কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। চাঁদটার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আপনি চান আমার চাকরিটা চলে যাক ? এখানে আরও গেস্ট আছেন। স্টাফ আছেন। কেউ যদি স্যারকে জানিয়ে দেয়...’ দীপকের কথা শেষ হওয়ার আগেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায় মেয়েটা। কোনও কথা না বলে চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে ঢোকে। দরজাটা বন্ধ করে দেয়।
[তিন]
আজকে সকাল থেকেই কখনো মেঘলা কখনো রোদ ঝলমলে আকাশ। মিষ্টি এলাচ-এলাচ একটা গন্ধ বাতাসে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে দীপকের নাকে এসে ধরা দিচ্ছে। সম্ভবত ছাতিম ফুলের গন্ধ। এদিকটায় ছাতিম গাছ প্রচুর না থাকলেও কমবেশি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বেশ কিছুটা দূরে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাশ ঝাড়গুলো। আর কদিন পরেই কাশ ফুল ফুটবে। হঠাৎ করেই বাড়ির কথা মনে পড়ে দীপকের। সব হিসেব-নিকেশ কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেছে। সেই দিনরাত জেগে পড়াশুনার দিনগুলো আজ বেকার বলে মনে হয়। এটাই যদি নিয়তি ছিল তাহলে এত পড়াশুনার...
‘এদিকটা বেশ নিরিবিলি তাই না ?’ হঠাৎ মেয়েলি কণ্ঠ কানে আসতেই চমক ভাঙে দীপকের। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে রয়েছে। সদ্য স্নান সেরে এসেছে মনে হয়। চুলগুলো এখনো ভেজাই রয়েছে। কিন্তু ওর শাড়ি পরার কারণটা মাথায় ঢোকে না দীপকের।
‘চুপ করে রইলেন যে ?’
‘না মানে আপনি এত দূর একা একা!’
‘আপনিও তো একাই এসেছেন। আসলে যারা ভেতরে ভেতরে একা তারা হয়তো একাই ঘুরতে ভালবাসে...’
‘আর আপনার দিদি জামাই বাবু ?’
‘ওরা আমার দিদি জামাই বাবু নয়...’ হাসতে গিয়েও হাসতে পারে না মেয়েটা ‘উনি আমার স্বামী আর ওই মেয়েটা উনার... ছাড়ুন ওসব কথা। চলুন না ওই জঙ্গলটা থেকে ঘুরে আসি। ওখানে অনেক ময়ূর আছে শুনেছি। যাওয়া হয়নি কোনওদিন।’
‘কিন্তু...’
‘আজকে আমার জন্মদিন। তাই প্লিজ...’
কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারে না দীপক। হাজার প্রশ্নের ভিড়েও কোথায় যেন একটা কষ্ট হয় ওর। কে কার স্বামী হয়ে কার বিছানায় ঘুমোচ্ছে সেটা দেখা দীপকের কাজ নয়। হোটেল বুকিং আছে পরিনিতা চ্যাটার্জ্জীর নামে, সে অলোক চ্যাটার্জ্জীর স্ত্রী হয়ে পাশের রুমে একলা ঘুমোলে দীপকের কিছু করার নেই।
‘কী এত ভাবছেন ? চলুন না...’

এদিকটায় দীপক একবারই এসেছে। গেস্ট হাউস থেকে জায়গাটা বেশ দূরে। পরিচিত অপরিচিত নানান পাখির দেখা মেলে এদিকটায়। এই জঙ্গলটার ভেতরেই প্রথম ময়ূর দেখেছিল দীপক। এই জায়গাটার কথা পিক্লু বলেছিল দীপককে। 
‘আপনি কিন্তু আমাকে শুভেচ্ছা জানালেন না...’
‘ও হ্যাঁ তাই তো... সরি, শুভ জন্মদিন। প্রতিটা দিন আনন্দে কাটুক। অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল। আপনি যদি বলেন তো গেস্ট হাউসের তরফ থেকে আমরা আজকে সন্ধায় ছোটখাটো একটা...’
‘ধন্যবাদ। অতশতর প্রয়োজন নেই। আমার জন্মদিনে কোনওবারই ধুমধাম হয় না। হওয়াও উচিৎ নয়।’
‘কেন ? হওয়া উচিৎ নয় কেন ?’
‘আজকে আমার বাবার মৃত্যু দিন...’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটা, ‘আমাকে প্রথমবার দেখতে আসছিলেন বাবা। জানি না কেমন করে এক্সিডেন্ট হয়েছিল।’
‘আই এম সরি। আমি অজান্তে আপনাকে কষ্ট দিলাম।’
‘এতে কষ্ট দেওয়ার কিছুই নেই। আমি জানি না বাবা কী জিনিস তাই বাবাকে হারানোর কোনও দুঃখ কষ্ট নেই আমার ভেতর। বরং বলতে পারেন ওই বাবা শব্দটাকেই ঘেন্না হয় আমার।’
‘প্লিজ এভাবে বলবেন না। যতই হোক উনি আপনার...’
‘উনি কেমন ছিলেন না ছিলেন আই ডোন্ট নো। বাট উনার মৃত্যুর জন্য মা ঠাকুমা-ঠাকুরদা আমাকে আজীবন ঘেন্না করেছে। দূরে সরিয়ে রেখেছে। ইউ নো আমি মদ-গাঁজা সব খাই ? শুধু ওই লোকটার জন্য। আমার নাম পর্যন্ত ছিল না জানেন! আমার মুখ দেখে গ্রামের কোনও লোক কোনও শুভ কাজে যেত না। পাড়ার বাচ্চারাও স্কুলের পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় আমার মুখ দেখত না। কুঁকড়ে কুঁকড়ে বড় হয়েছি ওই বাবার জন্য। তারপর একদিন ভাবলাম স্বাধীন হব। বাড়ি ছেড়ে দিলাম। যা খুশি তাই করলাম। এমনকি বিয়েও। কিন্তু কী পেলাম। কিছুই না, কিচ্ছু না...’
‘প্লিজ আজকের দিনে অন্তত কাঁদবেন না। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনার স্বামী...’
‘আমি নিজেই নিজের নাম রেখেছিলাম, পরিনিতা। আসলে কোনও দিক দিয়েই তো পরিণত নই তবুও নিজেকে পরিনিতা ভাবতে বেশ ভাল লাগে। ডাক্তার বলেছে আমি কোনওদিন মা হতে পারব না। আমি খুশি হয়েছিলাম। অন্তত আরেকটা অপরিনিতা জন্মাবে না, কী বলেন ?’
‘ওদিকে তাকিয়ে দেখুন...’
‘ও-য়া-ও... সত্যিই অপূর্ব, তাই না ? আমি ময়ূরকে নাচতে প্রথম দেখছি। দেখুন দেখুন পুরো পেখমটা মেলে দিয়েছে।’
‘এটা ময়ূর নাচার সময় নয় কিন্তু। তবুও ও নাচছে। জন্মদিনে এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে বলুন। আপনি যে নিজের নামটা ভুল রাখেননি ময়ূরটা কিন্তু তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।’
‘ধুর ওটার সঙ্গে এটার কোনও সম্পর্ক নেই।’
‘আপনার বাবার মৃত্যুর সঙ্গেও আপনার জন্মের কোনও সম্পর্ক নেই। মদ-গাঁজায় জীবন কোথায় ? জীবন আপনার চোখের সামনে নাচ করছে। আপনি যে পরিনিতা সেটা প্রমাণ আপনাকেই করতে হবে।’
‘আপনি তো দেখছি দারুণ কথা বলেন।’
‘লিখিও...’
‘আপনি লেখক ?’
‘না লেখক নই। নিজেকে লেখক ভাবতে ভাল লাগে তাই লিখি।’
‘আমার ওসব কোনও গুন নেই...’
‘আপনার গানের গলা খুব সুন্দর। কালকে রাতে শুনেছি।’
‘সুন্দর না ছাই। ওই পেটে পড়েছিল বলেই...’
‘চলুন ফিরতে ফিরতে কথা বলা যাবে। বৃষ্টি নামবে মনে হয়।’
‘নামুক না। আমার ভিজতে ভালই লাগে। তাছাড়া বৃষ্টি হলে এখানে আরও ময়ূর আসতে পারে।’
বলতে না বলতেই ফোঁটা-ফোঁটা করে শুরু হয় বৃষ্টি। একটা সেগুন গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়াল ওরা। ময়ূরটা নিজের খেয়ালে এখনো নেচেই যাচ্ছে। ওর নাচ থামার কোনও লক্ষণ নেই।
‘একটা গান শোনাবেন প্লিজ ?’ পরিনিতার চোখে চোখ রেখে কথাটা বলে দীপক।
‘এখন ? ধুর...’
‘প্লিজ না বলবেন না।’
‘আমি কিন্তু রবি ঠাকুরের বাইরে কিছুই জানি না।’
‘রবি ঠাকুরের ভেতর যা আছে তাতে একটা জীবন আরামে কেটে যাবে। আপনি ওই গানটা জানেন, এমন দিনে তারে বলা যায়...’
‘অল্প জানি।’
‘আচ্ছা তবে অল্পই শোনান। আজকে ওই গানটা সকাল থেকেই খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।’
সেগুন গাছের তলা থেকে সরে এসে খোলা আকাশের নীচে বৃষ্টিতে দাঁড়ায় পরিনিতা। তারপর আপন মনেই গুনগুন করে ওঠে,-

“এমন দিনে তারে বলা যায়
এমন ঘনঘোর বরিষায়।

এমন দিনে মন খোলা যায়-
এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে
তপনহীন ঘন তমসায় ।।

সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারি ধার।

দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,
আকাশে জল ঝরে অনিবার –
জগতে কেহ যেন নাহি আর ।।”
-পায়ে পায়ে দীপক পরিনিতার পাশে এসে দাঁড়ায়। আজ কেন যেন খুব কান্না পাচ্ছে ওর। বৃষ্টিটা বাড়ছে আবার। রবি ঠাকুরের প্রাণের সুরে সুরে ভিজতে থাকে ওরা। আজকের বৃষ্টিতে অনেক দগ্ধস্মৃতি ধোয়া হয়ে যাবে ওদের।
‘আপনিও গান না আমার সঙ্গে’
“সমাজ সংসার মিছে সব,
  মিছে এ জীবনের কলরব।
    ...”
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে এবার। রবি ঠাকুরের সুর বৃষ্টির দানায় দানায় ভেসে যাচ্ছে সুবর্ণরেখার দিকে। ওরা গাইছে। বৃষ্টিরে পুড়তে পুড়তে ওরা গাইছে।
                                        [সমাপ্ত]

সোমবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

ফেব্রুয়ারী ১২, ২০১৮

মনভাঙা প্রেমের গল্প, তবুও ভাল থেকো ভালবাসা

সিটি গোল্ডের আঙটি

সিটিগোল্ডের আংটি
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়

এখন মধ্যরাত্রি ছুটছে জানালার ওপারে। শনশন করে কামরার ভেতর ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকছে। তবুও জানালাটা বন্ধ করেনি শুভঙ্কর। জানালার রডে মাথাটা হেলান দিয়ে ও দূরের লাইট গুলোর দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টিতে। অনেক দূরের আলোআঁধার গ্রাম গুলোকে দেখে মনে হচ্ছে সূর্যোদয়ের সময় হয়ে এল যেন। আর এই পথ দিয়ে কোনদিনেই আসা হবে না ওর। হয়তো তাই পাঁচ বছরের না পড়া রাস্তাটাকে এক রাতেই পড়ে ফেলতে চাইছে শুভঙ্কর। ট্রেনের কামরাটায় যাত্রীও তেমন নেই। যে কয়েকজন আছে তারা গভীর ঘুমে সাঁতার দিচ্ছে। কিছুই ভাল লাগছে না এখন শুভঙ্করের। লিপিকে পর্যন্ত একটাও কল করে নি আজকে সকাল থেকে। কল করেই বা বলবেটা কী ? বললেও তো আর বন্ধ হওয়া স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটা টুক করে চালু হয়ে যাবে না।
অন্যান্য বারের বাড়ি ফেরার সঙ্গে শুভঙ্করের আজকের এই বাড়ি ফেরাটায় অনেক ফারাক। আজকে আর লিপির জন্য আংটিও কেনে নি। ইচ্ছে করেই কেনে নি। অন্যান্য বার বাড়ি ফেরার সময় নিয়ম করেই লিপির জন্য একটা করে আংটি কিনে এনেছে। সিটিগোল্ডের আংটি। লিপি বরাবরেই আংটি পরতে ভালবাসে। তবে ইদানীং আংটি পরার চেয়েও আংটি জমা করাতেই ওর ঝোঁকটা যেন বাড়ছিল দিনদিন। সেটা শুভঙ্করের চোখ এড়ায় নি। একটা সামান্য স্পঞ্জ আয়রন কারখানার সাধারণ সুপারভাইজারের কাজ করে শুভঙ্কর। না, কাজ করে বললে ভুল বলা হবে। কাজ করত। কতই আর বেতন ছিল ওর ? তাই বাধ্য হয়েই সিটিগোল্ডের আংটি উপহার দিতে হয়েছে লিপিকে। লিপিও শুভঙ্করের দেওয়া সিটিগোল্ডের আংটি গুলোকেই সোনার চেয়েও বেশি যত্ন করে রেখেছে নিজের কাছে। আবার যখন যেটা ইচ্ছে হয়েছে তখন সেটা পরেছে। আজকেই প্রথমবার আংটি নেয় নি শুভঙ্কর।
শুধু শুভঙ্কর কেন কেউই তো ভাবে নি দুম করে কারখানাটা বন্ধ হয়ে যাবে। ভালই তো চলছিল। কী এমন দরকার ছিল ইলেকট্রিক চুরি করতে যাওয়ার! চুরির ইলেকট্রিক দিয়েই কারখানার একটা আস্ত চুল্লি চলছিল এতদিন! অথচ শুভঙ্কর সুপারভাইজার হয়েও কিচ্ছুটি টের পায় নি। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে শুভঙ্করের নাকমুখ দিয়ে। বাইরের ঠাণ্ডা বাতাস ওর চুল গুলোকে এলোমেলো করে দিয়ে যায়। জানালাটার থেকে মাথাটা সরিয়ে নেয় শুভঙ্কর। ওর এখন মনে হচ্ছে এই যাত্রীবাহী ট্রেনটার সঙ্গে যেন সমান ভাবে পাল্লা দিয়ে আরেকটা ট্রেন ছুটছে ওর বুকের ভেতর। দুশ্চিন্তার ট্রেন।
তিন তিনবার এস এস সি পরীক্ষা দিয়েও যখন কিছুই সুবিধে হল না তখন বাধ্য হয়েই পেটের টানে বেরিয়ে পড়েছিল শুভঙ্কর। পাড়ার এক দাদার সাহায্যে স্পঞ্জ আয়রন কারখানার সুপারভাইজারের একটা কাজ জুটেও গিয়েছিল। লিপির ইচ্ছেছিল না শুভঙ্কর ওকে ছেড়ে বাড়ির বাইরে যাক। তাই বারবার বলেছিল, ‘এতটা দূরে কাজ করতে যাওয়ার কোনও মানেই হয় না। বাপিকে তুমি একবার বলে দেখো, বাপি ঠিক কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে।’ 
শুভঙ্করেই পারে নি শ্বশুরের কাছে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সাহায্য চাইতে। কারণ ও ভাল মতোই জানত, যে শ্বশুর মশায় তাকে কোনদিন জামাই বলেই স্বীকার করেন নি তিনি দয়া করলেও করতে পারেন কিন্তু সাহায্য করবেন না। কিন্তু আজকে শুভঙ্কর কী বলবে লিপিকে ? কোন মুখে গিয়ে দাঁড়াবে লিপির কাছে ? হাজার দুশ্চিন্তার ভিড়ে মাথাটা যেন কেমন ভার হয়ে আসে শুভঙ্করের।
এক
‘চায়ে গরম, চায়ে গরম, গরম চা’- ভাবনার ভিড়ে শুভঙ্কর এতক্ষণ কোথায় তলিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ চাওয়ালার ডাকে সম্বিৎ ফেরে। রোড চন্দ্রকনা ষ্টেশনে এসে দাঁড়িয়েছে ট্রেনটা। ষ্টেশন চত্বরে বসে দুয়েকটা লোক চাদর মুড়ি দিয়ে ঝিমোচ্ছে। চাওয়ালাকে ডেকে এক কাপ চা নেয় শুভঙ্কর। চায়ের কাপে এক চুমুক দিতে না দিতেই ট্রেনটা মৃদুমন্দ গতিতে আবার চলতে শুরু করে। আর ঘণ্টা তিনেকের রাস্তা মাত্র।
এক হাতে ছোট্ট বেডিং আর পিঠে একটা মস্ত ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে সমস্যা হলেও মন্দ লাগছিল না শুভঙ্করের। ষ্টেশন থেকে কতটুকুই বা রাস্তা। ইতিমধ্যেই দুয়েকটা দোকান ঝাপ তুলে চুলোতে আগুন ধরিয়েছে। একটু পরেই ভিড় হয়ে যাবে রাস্তাটা। বিভিন্ন গ্রাম থেকে শাক সবজি নিয়ে আড়তে জড়ো হবে চাষিরা। মাছ পট্টিতেও ভিড় জমবে। মাছের আঁশটে গন্ধে মম করবে বাজারটা। আর কোনদিকে না তাকিয়ে শুভঙ্কর বাড়ির মুখে চলতে থাকে।
যখন শুভঙ্কর বাড়ির দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় তখনো পূবের আকাশে আলো ফুটতে দেরি আছে। বাড়ির কলিং বেলটার সুইচে আঙুল দেবার আগে মনে মনে সংলাপ গুলোকে আরেকবার ভালভাবে সাজিয়ে নেয়। তারপর চাপ দেয় কলিং বেলে। বেল-এর আওয়াজটা বাইরে থেকেই শোনা যায়। কয়েক সেকেন্ডের বিরতির পর আরেকবার বাজায় বেলটা। আরও একবার। এবার মৃদু শব্দ করে খুলে যায় দরজাটা।
‘গুড মর্...র্নিং’ 
‘মর্নিং। তা এত ভোরে ? তাও আবার কিছু না জানিয়ে। শরীর ভাল আছে তোমার ?’ বেশ চিন্তিত দেখায় লিপিকে। এভাবে শুভঙ্করকে দেখে ঘাবড়ে গেছে হয়তো।
‘হুম শরীর ভালই আছে। আগে একটু চা করো তারপর সব বলছি।’- ঘরে ঢুকেই বেডিং আর ব্যাগটাকে মেঝেতে নামিয়ে ধপাস করে সোফায় বসে পড়ে শুভঙ্কর। কী আর বলবে লিপিকে ? কাজ চলে গেছে। তোমার বাবাকে বলে কিছু একটা ব্যবস্থা করতে বলো! না, একথা বলতে পারবে না ও। তাহলে কী বলবে ?
‘আমি হাত পা ধোবার জন্য আগে গরম জল করে দিচ্ছি। তুমি ততোক্ষণে জামা প্যান্টটা খুলে হালকা কিছু একটা পর। আর মোজা দুটোকে বাথরুমেই দিয়ে এসো।’ লিপি বলে।
‘সেই বরং ভাল। এখানে তো দেখছি ঠাণ্ডা এক্কেবারেই নেই। ওদিকেও কমেছে কিন্তু এতটাও নয়।’
লিপি গরম জল করতে যায়। রান্না ঘর থেকে টুংটাং শব্দ আসে। শুভঙ্কর দেওয়ালে ঝোলানো বাবা মায়ের ছবিটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নেয়। অনিচ্ছাতেও একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। যখন বাবা মারা যায় তখন শুভঙ্কর ক্লাস ফোর ফাইভ হবে হয়তো। মায়ের যাওয়াটা বছর দুয়েক হল। বাবার যা জমিজমা ছিল সব সুভদ্রার বিয়েতেই গেছে। সুভদ্রা শুভঙ্করের দিদি। বিয়ের পর কয়েকটা বছর নিয়ম করেই আসত সুভদ্রা। মা মারা যাওয়ার পর থেকে আসেনি বললেই চলে। যদিও মায়ের মৃত্যুটাই সুভদ্রার না আসার একমাত্র কারণ নয়। রনি বড় হচ্ছে। ওর স্কুল আর টিউশনের ঝামেলার জন্যই আসতে পারে না সুভদ্রা। শুভঙ্কর লিপিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল নিজের কাছে। লিপি রাজি হয়নি। বলেছিল, ‘মাস্টার ডিগ্রি কমপ্লিট না করে আমি কোথাও যাব না। নীচে গাঙ্গুলি অ্যান্টিরা যত দিন ভাড়া আছেন আমার একা থাকতে কোনও সমস্যা নেই।’ শুভঙ্কর কাজে জয়েন করার পর লিপি একাই থেকেছে।    
‘তুমি এখন স্নান করবে না পরে ?’ রান্না ঘর থেকেই জিজ্ঞেস করে লিপি।
‘মাথা খারাপ হয়েছে না কি। স্নান দশটার আগে নয়।’
বাথরুমে হাত পা ধুতে গিয়ে শুভঙ্কর লক্ষ্য করে বাথরুমের কোনায় কয়েকটা সিগারেটের টুকরো পড়ে আছে। আগেও একবার দেখেছিল। তখন লিপি কথা দিয়েছিল আর খাবে না। অন্যদিন হলে হয়তো বেশ রেগেই যেত শুভঙ্কর। আজকে রাগও হল না। পরিচিত দীর্ঘশ্বাসটাই বেরিয়ে এল আবার।
পড়ন্ত বিকেলে ছাতের উপর এসে দাঁড়ায় শুভঙ্কর। সকালে চা খেতে খেতেও লিপিকে বলতে পারে নি কারখানা বন্ধ হওয়ার কথাটা। লিপিও কিছুই জানতে চায়নি। ব্যাগ আর বিছানা পত্র দেখে হয়তো সবেই বুঝতে পেরেছে তাই কিছু জানতে চায়নি। ছাতের পশ্চিম কোনায় দাঁড়িয়ে শুভঙ্কর দূরের পলাশ গাছ গুলোকে তাকিয়ে আছে একমনে। বসন্তের রঙ লেগেছে গাছ গুলোতে। লাল সূর্যটার সঙ্গে পলাশ ফুল গুলোও সমান ভাবে পাল্লা দিচ্ছে।
‘তোমার চা’- পিছনে চায়ের কাপ হাতে এসে দাঁড়িয়েছে লিপি।
‘দেখো পলাশ ফুল গুলো সূর্যের সাথে পাল্লা দিচ্ছে।’
‘সত্যিই সুন্দর লাগছে। তুমি না থাকলে ছাতে এসে তেমন ভাবে দাঁড়ানোই হয় না। ছাত বলতে তো আমার কাছে কাপড় মেলতে আসা আর কাপড় তুলতে আসা।’
‘সারাদিন সিরিয়াল না দেখে মাঝে মাঝে ছাতে এসে দাঁড়িও মনটা ভাল থাকবে।’
‘এবার তুমি তো আমার সঙ্গে এখানেই থাকবে তাই মাঝে মাঝেই ছাতে আড্ডা দেবো দুজনে।’
‘তুমি কেমন করে জানলে আমি এবার এখানেই থাকব ?’ প্রশ্নচিহ্নটা পরিষ্কার ভাবে শুভঙ্করের চোখে মুখেও ফুটে ওঠে।
‘ঠিক যেমন করে জেনেছিলাম তুমি আমাকে ভালবাস।’
‘স্পঞ্জ আয়রন কারখানাটা সোমবার বন্ধ হয়ে গেল দুম করেই। আর খুলবে বলেও মনে হয় না।’
‘সোমবারের পরেও তো কতবার ফোন করলে একবারও তো বল নি সে কথা।’
‘চিন্তা করবে ভেবেই বলি নি।’
‘চিন্তা না ছাই। আমি মনে মনে ওটাই চেয়ে এসেছি এতদিন।’
‘তাই নাকি?’ হেঁয়ালির সুরে কথাটা বলে শুভঙ্কর।
‘অবশ্যই। কোন মেয়েটা বিয়ের পর স্বামীর থেকে দূরে থাকতে চাইবে শুনি।’
শুভঙ্কর কিছু বলে না শুধু লিপির নাকে আলতো করে নাড়া দেয়।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। লিপি চায়ের কাপ দুটো নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে যায়। শুভঙ্কর কল্পনাতেও ভাবে নি পুরো ব্যাপারটা এত সহজেই মিটে যাবে। এখন শুভঙ্করের নিজেকে বেশ হালকা লাগছে। এখন শুধু একটা কাজ পেয়ে গেলেই হল। 
দুই
দুয়েকটা দিন কাটতে না কাটতেই শুভঙ্কর লিপির ভেতর একটা অদ্ভুত পরিবর্তন খেয়াল করে। লিপি একবারের জন্যেও শুভঙ্করকে বলে নি ওর বাবার কাছে সাহায্য চাইতে। অন্যান্য সময় হলে হয়তো, ‘বাপিকে বলো বাপিকে বলো’ বলে বলেই শুভঙ্করের মাথাটা খারাপ করে ছাড়ত। ইদানীং বাবা মাকে তেমন একটা ফোনও করে না লিপি। আগে সারাদিনে চারবার ফোন করত কম করে। শুভঙ্কর একবার ভেবেছিল লিপিকে জিজ্ঞেস করবে ওর বাবা মায়ের সঙ্গে কিছু...। সেটা আর জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি। সেদিন সিগারেট খাওয়া ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করাতে লিপি এমন ওভার রিয়েক্ট করেছিল যে...
যাই হোক আসল কথা হল এই কয়েকদিনের ভেতর শুভঙ্কর বেশ কয়েকটা ইন্টার্ভিউ দিয়ে এসেছে নানান জায়গায়। কিন্তু কেউ কোনও খবর দেয় নি। এমন ভাবে বেশিদিন চললে হয়তো শুভঙ্করকে নিজের থেকেই শ্বশুর মশায়ের কাছে সাহায্য চাইতে হবে। এই দুবছরে যে কয়েক হাজার জমেছে সেটা শেষ হতেও বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের যা অবস্থা তাতে পাঁচ দশ হাজার টাকার একটা কাজ জোগাড় করাও মুখের কথা নয়। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার ফ্যালফ্যাল করে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোথাও একটু গুড়ের গন্ধ পেলেই ভনভন করে জড়ো হচ্ছে হাজার হাজার মাছি।
আজকেও একটা ইন্টার্ভিউ আছে বিষ্ণুপুরে। মার্কেটিং কোম্পানির। মাইনে হাজার দশেক। তাই শুভঙ্কর সকাল সকাল বেরিয়েছে সামান্য ডাল ভাত খেয়েই। প্রতিদিনের মতোই আজকেও একটা চাপা উত্তেজনা কাজ করছে ওর বুকের ভেতর। 
ষ্টেশন থেকে বেরিয়েই কোনও দিকে না তাকিয়ে রাজা বাঁধের পথ ধরে সোজা হাঁটতে থাকে শুভঙ্কর। বিষ্ণুপুর ওর অচেনা জায়গা নয়। মাস্টার ডিগ্রি করার সময় দূর্বাদল বাবুর কাছে টিউশন পড়তে প্রায় বছর দেড়েক বিষ্ণুপুরে আসতে হয়েছে শুভঙ্করকে। রাজা বাঁধ পেরিয়ে বাজাজ সোরুমের পাশের গলিটা ধরে সোজা হাঁটলেই মিথিলা পাম্পের সোরুমটা। মিথিলা কোম্পানিই লোক নিচ্ছে মার্কেটিং এর জন্য। চারজন নেবে।
পরিচিত রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছাতে শুভঙ্করের বিশেষ সময় লাগল না। কিন্তু মিথিলার গেটের কাছে পৌঁছে শুভঙ্কর যা দেখল সেটা ব্যাখ্যা করার মতো নয়। লোক নেবে চারজন আর ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে প্রায় পাঁচ সাতশোর মতো ছেলে মেয়ে। ছেলে মেয়ে গুলো আলাদা আলাদা দুটো লাইন করে দাঁড়িয়েছে। ছেলেদের লাইনটা যে কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে সেটা চোখেও পড়ল না শুভঙ্করের।
বেশ কিছুক্ষণ লম্বা লাইনটার দিকে তাকিয়ে থাকার পরেও শুভঙ্কর ঠিক করতে পারল না ইন্টার্ভিউটা দেবে না বাড়ি ফিরে যাবে। তবে মোটের উপর ওর এটা বুঝতে বাকি রইল না যে, এখানে ইন্টার্ভিউ দিয়েও বিশেষ পড়তা হবে না। শেষ পর্যন্ত একটা বট গাছের নীচে চুপচাপ বসে শুভঙ্কর। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হঠাৎ করেই ওর চোখ পড়ে যায় মাঝ বয়সী এক ভদ্রলোকের উপর। ভদ্রলোকটিকে দেখে তো ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে বলে মনে হয় না। হালকা গেরুয়া রঙের একটা পাঞ্জাবী আর নীল জিন্সে লোকটির সঠিক বয়স বোঝা না গেলেও উনার কাঁচাপাকা চুলদাড়ি দেখেই যে কেউ বলে দেবে লোকটির বয়স চল্লিশের কম হবে না। শুভঙ্করের কেন যেন মনে হল লোকটা চোখের ইশারায় ওকেই ডাকছে। প্রথমটায় বেশ একটু ঘাবড়ে যায় শুভঙ্কর। ভদ্রলোক শেষমেশ নিজেই এগিয়ে আসেন। টুকটাক পারিবারিক কথাবার্তা দিয়ে শুরু করার পর ভদ্রলোক শুভঙ্করকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কি ইন্টার্ভিউ দিতে... ?’
‘হাঁ। আর আপনি ?’ ভদ্রলোকের মুখ থেকে কথাটা কাড়িয়ে নিয়ে পালটা প্রশ্ন করে শুভঙ্কর।
‘আমি এসেছি মজা দেখতে।’
‘মাফ করবেন ঠিক বুঝলাম না।’
‘এই যে লম্বা লাইন দুটো দেখছেন এই লাইন দুটোতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যেকটা ছেলে মেয়েই ভাবছে ওর চাকরিটা হলেও হতে পারে। আপনিও একেই ভাবনা নিয়ে এসেছিলেন তাই তো ?’
‘হাঁ তাতে কী হয়েছে ?’
‘সময় নষ্ট।’
‘হেঁয়ালি না করে আসল কথাটা বলবেন প্লিজ।’ এবার শুভঙ্করের গলায় যথেষ্ট বিরক্তি প্রকাশ পায়।
‘আরে মশাই এতে রাগের কী হল ?’
‘না রাগ করছি না। বলছি আপনার কিছু বলার থাকলে না ভাটিয়ে পরিষ্কার করেই বলতে পারেন।’
‘আপনি চাকরিটা পেতে চাইছেন ?’
‘নতুবা আসব কেন বলুন ?’
‘তাহলে এখানে বসে না থেকে বাড়িতে গিয়ে এক লাখ টাকা জোগাড় করবেন যান।’
‘মানে ?’ 
‘এই কথাটার মানে বোঝার মতো বয়স আপনার হয়েছে। আমার একটা কার্ড রাখুন এক মাসের ভেতর টাকাটা জোগাড় যদি করতে পারেন তাহলেই ফোন করবেন। চিন্তা করবেন না প্রথম মাসের বেতন পাবার পরে টাকাটা নেব। কিন্তু টাকাটা জোগাড় করে রাখবেন।’
‘আর চাকরিটা পাবার পর...’
‘টাকাটা যদি না দেন তাই তো ? ওটা আপনার ভাবনা নয়।’ ভদ্রলোক পাঞ্জাবীর পকেট থেকে একটা রজনীগন্ধার প্যাকেট বেরকরে সেটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে কথা গুলো বলে। কথা গুলো বলার পর পকেট থেকে আরেকটা তুলসীর প্যাকেট বার করে। দুটোকে মিশিয়ে মুখে ঢালার পর পাঞ্জাবীর বুক পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে শুভঙ্করের হাতে ধরিয়ে দেয়। আর কোনও কথা বলে না। সোজা চলতে থাকে মেয়েদের লাইটার দিকে। শুভঙ্করের সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়।                        
তিন
এক বন্ধুর কাছে শুভঙ্কর খবর পেয়েছে হরিগ্রাম স্কুলে কন্ট্রাক্ট চ্যুয়াল শিক্ষক নেবে। মাইনেটাও মন্দ নয়। আর যাই হোক শুভঙ্কর পড়াশুনাতে তো কোনদিনেই খারাপ ছিল না। তাই সম্ভাবনা একটা আছেই। কিন্তু পরীক্ষাটা দিতে যাবে কেমন করে! ওর পকেট তো এখন...
সেদিন বিষ্ণুপুর থেকে বাড়ি ফিরে আসার পর আর কোথাও কোনও ইন্টার্ভিউ দিতে যায় নি শুভঙ্কর। ওর পক্ষে অতটা টাকা জোগাড় করাও সম্ভব ছিল না। আর সামান্য কোম্পানির কাজের জন্য একটা অচেনা অজানা লোককে অতটা টাকা দিতেই বা যাবে কেন। বিষ্ণুপুর থেকে ফিরে আসার পরের দশদিন শুভঙ্কর শুধু এটাই ভেবেছে, কোম্পানির চাকরিতে ঘুষ কেন দেবো! এই ব্যাপারে লিপির সঙ্গেও কথা বলেছিল শুভঙ্কর। বিশেষ লাভ হয়নি। লিপি চায় শুভঙ্কর চাকরিটা করুক। কিন্তু এই মুহূর্তে এতটা টাকা...। এই কয়েকটা দিন শুভঙ্কর কোথাও ইন্টার্ভিউ দিতে যায়নি শুধুমাত্র টাকার জন্যই। কয়েকটা দশ টাকার নোট ছাড়া পকেট কাটলেও এর বেশি আর কিছুই বার হবে না। ব্যাঙ্কে পঞ্চাশ হাজার ফিক্সড করা আছে ঠিকেই, কিন্তু ওই টাকাটাতে হাত দিতে চায় না শুভঙ্কর। বিপদে আপদে দরকার পড়লে তখন কী করবে...? 
দূরের ছেঁড়াফাটা মেঘ গুলোর ভেতর চাঁদটা আজকে নৌকার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘুম আসছিল না শুভঙ্করের। তাই ছাতে এসেই দাঁড়িয়েছে এত রাতে। ছাতের ঠাণ্ডা বাতাসটা ভালই লাগছে এখন ওর। অনেক দূরের কোনও গ্রাম থেকে কুকুরের ডাক ভেসে আসছে মাঝে মাঝে। একটা সময় এই ছাতে মাদুর বিছিয়ে সারারাত তারাদের সঙ্গে শুয়ে থাকত শুভঙ্কর। আজকে তারা গুলোকেও যেন অচেনা লাগছে। হরিগ্রামের স্কুলটাতে ইন্টার্ভিউ দিতে যাবার ইচ্ছে তো আছে অথচ যায় কেমন করে। এক দুশো টাকা ধার চাইলে হয়তো অনেকেই দিয়ে দেবে। কিন্তু শোধ তো ওকেই করতে হবে। এমনিতেই গোপালের দোকানে ধারের খাতাটা লম্বা হচ্ছে দিনদিন। যেদিন গোপাল জানবে শুভঙ্করের চাকরিটা আর নেই সেদিনেই হয়তো... 
লিপিও পাল্টে গেছে সময়ের সাথে। শুভঙ্করকে ছাড়াই এখন থাকতে শিখে গেছে লিপি। সারাদিন ফেসবুকেই ডুবে থাকে। যে মাস্টার ডিগ্রির দোহায় দিয়ে লিপি একদিন শুভঙ্করের সঙ্গে যায় নি সেই মাস্টার ডিগ্রির ক্লাস করতে যাওয়ার নামও নেই ওর মুখে। পড়াশুনা তো অন্য গ্রহের গল্প। তবে শুভঙ্কর খেয়াল করেছে এত দুশ্চিন্তার সময়েও লিপি সিগারেট খায় নি। যদিও শুভঙ্কর কোনদিনেই লিপিকে সিগারেট খেতে দেখনি। দেখেছে সিগারেটের পোড়া টুকরো গুলোকেই। তবে পাশের বাড়ির লোক তো আর এই বাড়িতে সিগারেট খেতে আসবে না। 
নিজের ভাবনার ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতেই একটা সময় শুভঙ্কর থমকে দাঁড়ায় নিজের ভেতর। একটা উপায় এসেছে মাথায়। লিপিকে উপহার দেওয়া সিটিগোল্ডের আংটি গুলো। হাঁ ওগুলো বিক্রি করেও তো...। চাকরিটা পেয়ে গেলে না হয় লিপিকে অমন আংটি আবার কিনে দেওয়াই যাবে। অন্ধকারেও যেন ওর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। সত্যিই এই মুহূর্তে কিছুটা টাকার খুব দরকার শুভঙ্করের।
চোরের মতোই শোবার ঘরে ঢোকে শুভঙ্কর। লিপি গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। ওর এখন ঘুম ভাঙার কোনও সম্ভাবনা নেই। নিঃশব্দে আলমারি খুলে আংটি গুলোকে বারকরে শুভঙ্কর। আবার আলমারিটা বন্ধ করে ছাতে এসে দাঁড়ায়। তারপর হাতের তালুতে রাখা আংটি গুলোকে চোখের সামনে তুলে ধরে। অস্পষ্ট চাঁদের আলোতেও চকচক করে ওঠে আংটি গুলো। এতদিন আংটি গুলো ছিল সুখস্মৃতির টুকরো মাত্র। আজকে তার চেয়েও মূল্যবান কিছু।
চার
পরেরদিন সকাল সকাল আংটি গুলোকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে শুভঙ্কর। গিয়ে দাঁড়ায় সর্বমঙ্গলা জুয়েলার্সের সামনে। দোকানের ভেতর একজন বৃদ্ধ আপন মনে একটা মোটা খাতায় কীসব লিখছেন। ভেতরে ঢোকে শুভঙ্কর। কোনও রকম ভণিতা না করেই বলে, ‘বেশ কয়েকটা সিটিগোল্ডের আংটি আছে যদি বলেন...’
ভদ্রলোক মুখ না তুলেই হাতের ইশারায় শুভঙ্করকে চুপ করতে বলেন। কিছু হিসেব করছেন হয়তো। শুভঙ্কর পকেট থেকে আংটি গুলো বের করে।
‘হাঁ এবার বলুন।’ মোটা কাঁচের চশমার ফাঁক দিয়ে বৃদ্ধ ব্যবসায়ী দৃষ্টিতে শুভঙ্করকে একবার জরিপ করে নেয়।
‘বলছিলাম বেশ কয়েকটা সিটিগোল্ডের আংটি আছে ওগুলো বেচতাম।’
‘সিটিগোল্ড ?’ বেজার মুখেই শব্দটা উচ্চারণ করেন ভদ্রলোক।
‘হাঁ সিটিগোল্ডের।’
‘ওসব আংটি আবার কেউ বেচতেও আসে এই প্রথম দেখছি।’
ভদ্রলোকের কথায় শুভঙ্করের উজ্জ্বল মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে পড়ে। তবুও বলে, ‘ভাল দাম দিয়ে কেনা সবকটাই।’
‘আমি ওসবের কারবার করি না। অন্যকনো দোকানে দেখুন যদি কেউ কেনে। মনে তো হয় না ওসব কেউ কিনবে বলে।’ শাল পাতার মোড়কের ভেতর থেকে একটা পান বার করেন ভদ্রলোক। কথাটা শেষ করে পানটা মুখের ভেতর ঢোকান। শাল পাতার গায়ে লেগে থাকা চুনটা চেটে নেন জিব দিয়ে।    
ঠিক কী বলবে খুঁজে পায় না শুভঙ্কর। চুপ করে বসে থাকে। ভদ্রলোক শুভঙ্করকে বসে থাকতে দেখে আবার বলেন, ‘রাধামাধব ষ্টোরে গিয়ে দেখুন নিলে নিতেও পারে। তবে তেমন দাম পাবেন না।’
‘আচ্ছা এগুলো দেখে বলতে পারবেন কেমন দাম পাওয়া উচিৎ ?’
ভদ্রলোক হাত বাড়িয়ে শুভঙ্করের হাত থেকে আংটি গুলো নেন। বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে দেখে চোখ দুটোকে বড় বড় করে জিজ্ঞেস করেন, ‘চোরাই মাল নাকি ?’
‘না চোরাই মাল কেন হতে যাবে ?’
‘তাহলে এত গুলো সোনার আংটি কোথায় পেলেন মহাশয় ?’
‘সোনার আংটি নয় তো!’
‘সোনারেই তো। সত্যি করে বলুন না ঠিক কোথায় পেয়েছেন এত গুলো আংটি একসঙ্গে ?’
‘আপনি ভাল করে দেখুন ওগুলো সোনার নয় মোটেই।’
‘চল্লিশ বছর কারবার করছি মশাই। তাই আসল নকল চেনার বসয় আমার অনেক বছর আগেই হয়েছে। পেলেন কোথায় এত গুলো আংটি ?’
ভদ্রলোকের মাথাটা গেছে ভেবেই শুভঙ্কর বেরিয়ে গিয়েছিল দোকান থেকে। সেখান থেকে সোজা গিয়েছিল আরেকটা দোকানে। সেখানেও একেই কথা শুনতে হয়েছে শুভঙ্করকে। তারপর আরেকটা দোকান। তারপর আরেকটা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় প্রতিটা দোকানেই শুভঙ্করকে এক কথাই শুনতে হয়েছে বারবার। চোরাই মাল ভেবে আংটি গুলো কিনতে কেউই রাজি হয়নি শেষ পর্যন্ত। শুভঙ্করের কিছুতেই মাথায় ঢোকে না সিটিগোল্ডের আংটি গুলোকে কেন সবাই সোনার আংটি বলছে। 
আর যদি শুভঙ্কর অন্ধকারে ভুল করেই লিপির সিটিগোল্ডের আংটি গুলোর পরিবর্তে সোনার আংটি গুলোই নিয়ে থাকে তাহলেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, লিপিই বা এত গুলো সোনার আংটি পেল কোথায় ? ওর বিয়ের সময় অনেকেই আংটি দিয়েছিল ঠিক কথা কিন্তু তার সংখ্যা দশের বেশি হবে না। শুভঙ্করের কাছে পঁচিশটারও বেশি আংটি আছে। প্রতিটাই সোনার আংটি!
একবুক ক্লান্তি আর হতাশা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুভঙ্কর এসে দাঁড়ায় ছোট্ট শহরটার বুকে বয়ে চলা দ্বারকেশর নদীটার তীরে। নদীটার বুকে মুঠো মুঠো লাল ছড়িয়ে দিয়ে পশ্চিম দিগন্তে ডুবছে সূর্যটা এখন। শুভঙ্কর তাকিয়ে থাকে নদীটার দিকে। ওর চোখ দুটোও জলে ভরে আসে একটা সময়। বারবার আংটি গুলোকে নেড়ে চেড়ে দেখে। না, একটা আংটিকেও চিনতে পারছে না শুভঙ্কর। হাজার হাজার প্রশ্নের পোকা কিলবিল করছে ওর মাথায় এখন। কোথায় পেল লিপি এত গুলো সোনার আংটি ? কে দিল লিপিকে আংটি গুলো ? তাহলে কী সেদিনের সেই সিগারেটের টুকরো গুলোও... 
অল্প অল্প করে সব হিসেব যেন মিলে যাচ্ছে এখন। নদীর পারে জেগে থাকা বালির চরের উপরেই বসে পড়ে শুভঙ্কর। আর একটু পরেই নদীর জলে সন্ধা এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তারপর অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই থাকবে না নদীর চরে। অন্ধকারে শুভঙ্করকেও দেখা যাবে না আর। নদীর বালির উপরেই আংটি গুলোকে নামিয়ে রাখে শুভঙ্কর। তারপর একটা একটা করে ছুড়তে থাকে নদীটার জলে। শুভঙ্করের ভেতর থেকে কে যেন চিৎকার করে বলছে,- ‘লিপিকে দেওয়া সেই সিটিগোল্ডের আংটি এগুলো নয়। এগুলো লিপির আঁধার রাতের সঞ্চয়।’ গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠা শুভঙ্করের ঠোঁট দুটো কিছু একটা বিড়বিড় করে বলছে নদীটাকে। সেটা আর শোনা যাচ্ছে না। অন্ধকার নদীর চরে এখন দমকা হাওয়া বইছে।
                                   [সমাপ্ত]

শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

ফেব্রুয়ারী ০৩, ২০১৮

ভ্যালেন্টাইন ডে


ভ্যালেন্টাইন ডে
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


সবে পাঁচদিন মাত্র কাজে জয়েন করেছি। মাইনেটা আহামরি কিছু না হলেও খেয়ে পরে হাজার দুয়েক বাড়িতে পাঠাতে পারব। এটাই বা কম কীসের। গ্রামের মাটির গন্ধ ছেড়ে এতদূর আসার ইচ্ছে আমার মোটেই ছিল না। দ্বিতীয় রাস্তা খোলা থাকলে হয়তো কখনই আসতাম না। এখন যখন এসেই পড়েছি তখন ওসব ভেবেই আর কী হবে। তবে আমার মতো ঘরকুনো ছেলে এই শাল কাজুবাদামের জঙ্গলে মোড়া চালের মিলে কতদিন টিকতে পারে সেটাই দেখার।
একটা সময় ঝাড়খণ্ডের এই চাকুলিয়া অঞ্চলটায় রাজনৈতিক খুব উপদ্রব ছিল শুনেছি। এখন যদিও তার ছিটে ফোটাও নেই আর। বেশ নিরিবিলি শান্ত এলাকা। যেমন গাড়ি ঘোড়ার ঘ্যানঘ্যানানি নেই তেমন আকাশে গুঁতো মারতে ওঠা বড় বড় দালান বাড়িও নেই। সারাদিন নিজের কাজে ডুবে থাকো আর বিকেল-সন্ধ্যে বেলায় পাতলা জঙ্গলে পা’ডুবিয়ে ঘুরে বেড়াও। আমার কিন্তু খুব একটা মন্দ লাগছে না। রাতের দিকে একটু গা ছমছম করে যখন চাল মিলের দেওয়াল ঘেঁষে হাতির পাল পেরিয়ে যায়। এই পাঁচ দিনেই তিনবার হাতির পাল পেরিয়ে যেতে দেখেছি। মিলের কর্মচারীদের মুখে শুনেছি ওরা হাতির হাত থেকে জমি জমা রক্ষা করার জন্য ‘বুড়ো মাহুত ঠাকুর’ নামক গ্রাম্য দেবতার পূজা করে প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার। এখানকার কর্মচারীরাও বেশ নিরীহ নিষ্পাপ। বনানীর স্নিগ্ধতা ওদের মনে পাপ ঢুকতে দেয়নি এখনো। তাই ওদের জীবন স্রোতের সাথেই ওদের সরলতাও জড়াজড়ি করে আছে।
আর পি সিং এই চাল মিলের মালিক। পুরো নাম রুদ্র পুরি সিং। ভদ্রলোকের বাড়ি এখানে নয়, বিহারের সমস্তিপুরের কাছে। ওখান থেকে কীভাবে এখানে এসে ব্যবসা শুরু করেছেন সেটা আমার অজানা। ওসব জানার কৌতূহলও আমার নেই। আমার সময়ে টাকা পেলেই হবে। আজকে সকাল সকাল মালিক রামগড় বেরিয়ে গেছেন। ওখান থেকে রাঁচি হয়ে বেশ কয়েক দিন পরে ফিরবেন। শুনেছি রাঁচিতেও নাকি উনার চালের মিল আছে। উনার ছোট ভাই ওখানে দেখা শুনা করে।
এই পাঁচটা দিন আমার ভালোই কেটেছে। আজকে বিকেলের দিকে আর মিলের বাইরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মিলের পশ্চিম দিকের একটা কোনায় গিয়ে ঘাসের উপর বসে সূর্য ডোবা দেখছিলাম। শালগাছের মাথার উপর দিয়ে সূর্যটা নীচে ঢলে পড়ছে। পুরো আকাশটাই লাল হয়ে আছে এখন। সূর্যটাকে ডুবতে দেখে বারবার বাড়ির কথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। এই বিকেলের দিকে আমার ঘরের জন্য একটু বেশিই মন কেমন করে। বসে বসে মায়ের মুখটা মনে করছিলাম ঠিক এমন সময় আমার পিছন থেকে এক মধুর কণ্ঠ ভেসে এল, -‘কী বাঙালী বাবু এই জঙ্গলে মন লাগছে ?’ পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখলাম কাজুবাদাম গাছে হেলান দিয়ে এক যুবতী দাঁড়িয়ে। কালো জিন্সের উপর লাল রঙের টিশার্ট। কানে মোবাইলের হেডফোন গোঁজা। সুন্দরী বললে কম বলা হবে হয়তো। মেয়েটি তার প্রথম প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই তার দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছুড়ল আমার দিকে, ‘আপনার নাম কী যেন সরকার ?’
এবার আমি জবাব দিলাম, ‘ পার্থ প্রতিম সরকার।’
-‘বাঃ বেশ চমৎকার নাম তো আপনার। তা এখানে ভাল লাগছে ?’
-‘সেই চেষ্টাই চলছে। তা আপনাকে ঠিক...’
-‘চিনলেন না এই তো। আমি শরতের পাখি। প্রতি বছর এই সময়েই এখানে আসি। আমার নাম তন্নবি সিং। এই মিল মালিকের এক মাত্র মেয়ে। কলেজের পরীক্ষা শেষ, তাই ছুটি কাটাতে আরামবাগ থেকে সোজা বাবার কাছে এসেছি কদিন আগে। যদিও এবার দাদানের কাছে সমস্তিপুর যাবার কথা ছিল। গেলাম না। হালকা শিশিরের এই সময় টুকু এখানেই ভালো লাগে আমার তাই এবছরও চলে এলাম।’ 

কথা গুলো বলতে বলতেই শরতের পাখি অর্থাৎ তন্নবি আমার পাশে এসে বসে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কদিন আগেই এসেছেন কিন্তু আপনাকে আজকেই প্রথম দেখলাম। ঘরে বসেই সময় কাটান বুঝি ?’
-‘শরতের পাখিকে সব সময় দেখা  যায় কি ?’ কথাটা বলেই খিলখিল করে হাসে মেয়েটি। তারপর পশ্চিমের লাল আকাশটার দিকে তাকিয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করে। আমি ওর সাবলীলতা দেখে অবাক হয়ে যাই। হয়তো মালিকের মেয়ে বলেই ওর পক্ষে এতটা সাবলীল হওয়া সম্ভব। আমার ভেতরে কিন্তু কোথাও একটা আড়ষ্ট ভাব কাজ করছে। আমি চাই না মালিকের মেয়ের সঙ্গে কেউ আমাকে একান্তে বসে থাকতে দেখুক। পশ্চিমের আকাশটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একটা সময় পাখির চোখ দুটোতেও লালচে রঙের মেঘ জমা হয়। ডানহাতের আঙুল দিয়ে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে আমাকে জিজ্ঞেস করে, ‘সূর্য অস্ত যাবার সময় মনটা কেমন যেন খাঁ খাঁ করে ওঠে। এটা কী শুধু আমারই হয় ? আচ্ছা সূর্য অস্ত যাবার সময় আপনার কী মনে হয় ?’
আমি আরেকবার পশ্চিমের লাল আকাশটার দিকে চেয়ে দেখি। সত্যিই মনখারাপ করে দেওয়ার মতো সুন্দর। পাখির প্রশ্নের উত্তরে আমি বলি, ‘সূর্য অস্ত যাবার সময় মায়ের কথা, ছেলেবেলার কথা, স্কুল জীবনের কথা আমার খুব মনে পড়ে। মনে হয় যে দিনটা লোকচক্ষুর আড়ালে তলিয়ে গেল সেটা আর কোনোদিন ফিরবে না। এটা ভেবেই ভেতরে ভেতরে একটা কষ্ট হয়। ইচ্ছে করে নিজের দেখা প্রতিটা ছোট বড় জিনিশ প্রিয় জনকে দেখাই।’
-‘ঠিকেই বলেছেন। আমারও ইচ্ছে করে যা দেখছি যা শুনছি তা সবাইকে শোনাই সবাইকে দেখাই। ঐ যে বকের সারিটা জঙ্গলের ওপারে হারিয়ে যাচ্ছে ওটুকুও সবাইকে দেখাতে ইচ্ছে করে। দেখাতে পারি না বলেই একটা কষ্ট হয়। তবে সূর্য যখন অস্ত যায় আমার মনে হয়, যেন একটা গোটা জীবন পেরিয়ে গেল। আমার কাছে একটা দিন একটা জীবনের সমান জানেন। তাই আমি প্রতিটা দিন নতুন করে বাঁচি।‘
পাখিটির সঙ্গে কথা বলতে আমার বেশ লাগছিল। পাশে বসে এত সাবলীল ভাবে কোনও মেয়ে এর আগে আমার সঙ্গে কথা বলেনি। আমিও বলিনি।  দুজনের গল্প চলতে চলতে দূরের জঙ্গলটা বেয়ে যখন সন্ধ্যা চাল মিলের সীমানায় ঢোকে তখন আমরা উঠে পড়ি। হালকা চালে ফিরতে থাকি কোয়াটারের দিকে। এদিকটায় আসার পরেই খেয়াল করেছিলাম অনেক দূরের থেকে একটা কুলকুল কুলকুল শব্দ ভেসে আসছে। সন্ধ্যায় সব শান্ত হতেই শব্দটা যেন আরও পরিষ্কার শোনা যায়। শব্দটা কীসের জিজ্ঞেস করতেই তন্নবি বলে, ‘ওটা জোড়বাঁধের শব্দ। বর্ষার সময় দুপাশের জঙ্গলের জল গড়িয়ে গিয়ে জমা হয় ওখানে। কদিন আগে ওর বাঁধন ভেঙেছে। এখন জল গড়িয়ে যাচ্ছে নিজের খেয়ালে। সিংভুম জেলায় এমন জোড়বাঁধ প্রচুর আছে। চাষের সময় জোড়বাঁধের জল কাজে লাগে।’
বিকেল-সন্ধ্যার মুহূর্তটুকু ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুম আসতে অনেক দেরি হয়ে যায়। বারবার চোখের সামনে মালিক কন্যার মুখটাই ভেসে উঠে। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি মালিকের ঘরের আলোটাও জ্বলছে। হয়তো পাখিটিরও এখনো ঘুম আসেনি। তবে কী পাখি এই শাল কাজুবাদামের জঙ্গলে আমার মতোই পথ হারাল ? কী জানি।                  

আজকে রবিবার কাজের চাপ নেই বললেই চলে। এই রবিবার দিনটায় মিলের ভেতরকার কাজ চললেও বাইরে থেকে ধানের ট্রাক আসে না। মিলের থেকে চালের ট্রাকও বাইরে যায় না। মিলের দক্ষিণ পশ্চিম দিকের একটা কোনায় এক চিলতে বাগান আছে। বাগান বলতে ওই দেশি বিদেশি কিছু ফুলের গাছ আরকি। আমি বাগানটার বাইরে দাঁড়িয়ে রজনীগন্ধা ফুল গুলোকে দেখছিলাম। চোখ পড়ল শরতের পাখির উপর। পাখি এখন আনমনে দূরের দিকে তাকিয়ে কোথায় যেন ডুবে আছে। সেদিন সন্ধ্যার পর আর ওর সাথে দেখা হয়নি। আজকে ওকে দেখতে পেয়ে আমিই কাছে গেলাম। আমাকে কাছে আসতে দেখে হাসি হাসি মুখে পাখি জিজ্ঞেস করে,  ‘কী বাঙালী বাবু আজকে সকাল সকাল ঘুরতে বেরিয়েছেন ?’
ঠোঁট দুটোয় সামান্য হাসির রেখা টেনে আমি বলি, ‘আজকে তো কাজের চাপ কম তাই আরকি। তা আপনাকে তো এই কদিনে এক বারও দেখতে পাইনি। ভেবেছিলাম উড়ে গেছেন হয় তো।’
-‘যাক ভেবেছিলেন তাহলে বলুন ?’ কথাটা বলেই মুচকি মুচকি হাসে তন্নবি।
 -‘আমি ভেবেছিলাম আপনি হয়তো দেশের বাড়ি গেছেন।’
-‘না এবারের ছুটিতে আর কোথাও যাব না ভাবছি। এখানেই বেশ ভালো লাগছে। এমন প্রাণবন্ত সবুজ ফেলে কোথাও যেতেই ইচ্ছে করে না। আচ্ছা বাঙালী বাবু...’
-‘আপনি আমাকে পার্থ বলেই ডাকতে পারেন। আর আমাকে প্লিজ আপনি করে বলবেন না। কেমন যেন একটা অসোয়াস্তি হয় ভেতরে ভেতরে।’
-‘ওকে, তবে তাই হবে।’
-‘আচ্ছা আপনি তো বাঙালী নন তাহলে এত ভালো বাংলা বলছেন কী করে?’
-‘বাংলা বলার জন্য কী বাঙালী হওয়া লাগে ?’
-‘না ঠিক তা নয়। কিন্তু আপনি বাংলা...’
-‘আমাকেও আপনি বলে সম্বোধন না করলে খুশি হব। আমি তো ছোট থেকেই আরামবাগে মায়ের কাছে মানুষ। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক সবেই ওখান থেকে দিয়েছি। ওখানে থেকেই তো গ্রেজুয়েসেনও করছি। জানতেন না আপনি ?’
-‘না। আমি আবার কেমন করে জানবো।’

-‘বাবা মায়ের যখন ডিভোর্স হয় তখন আমি খুব ছোট। তখন থেকেই আরামবাগে মায়ের কাছে। কিন্তু বাবার কাছে এলে মা কোনও দিনেই বাধা দেয়নি। এখনো দুজন দুজনকে ভালবাসে কিন্তু কেবল মাত্র ইগোর জন্য কেও কাউকে কাছে ডাকতে পারে না। আমি মা বাবার ভাঙা সম্পর্কের সেতু বাঁধতেই উড়ে উড়ে এখানে আসি।’
-‘তোমার মা যখন তোমাকে এখানে আসতে মানা করেন না তখন মনে হয় চেষ্টা করলে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে।’
-‘চেষ্টা যে করিনি তা নয়। কিন্তু কাজ হয়নি। আচ্ছা এখন আমি যাই পূজার দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
-‘কী পূজা আজকে ?’
-‘না আসলে আমি এখানে এলেই ছিন্নমস্তার পূজা দিতে যাই। বহুকাল আগেকার মন্দির। বাবা বলে সাঁওতাল বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত নাকি মায়ের মন্দিরে নরবলি হত।’
-‘কোথায় মন্দিরটা ?’
-‘এই তো আমাদের মিলের ঠিক বিপরীত দিকে। তুমি যাবে আমার সঙ্গে ?’
-‘গেলে তো মন্দ হয় না।’
-‘আচ্ছা তাহলে স্নানটা সেরে নেবে যাও। আমি ভজুয়াকে বলে দিচ্ছি ওকে আর যেতে হবে না।’
স্নান সেরে তন্নবির সঙ্গে আমিও মিলের বাইরে আসি। দূরের থেকে দেখলেই বোঝা যায় কত প্রাচীন মন্দিরটা। শাল আর বটের নীচে দাঁড়িয়ে কয়েকশো বছরের ইতিহাস বয়ে নিয়ে চলেছে নির্জনে। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধুই জঙ্গল। এদিকটায় কাজুবাদামের গাছ তেমন একটা নেই বললেই চলে। মন্দিরের কাছে আসতেই চোখে পড়ে সিমেন্টের তৈরি বিশালাকার হাড়িকাঠটার উপর। মায়েই জানেন এই হাড়িকাঠে মাথা ঢুকিয়ে কত প্রাণ গেছে। এখন মন্দিরটার দশাও জরাজীর্ণ। মূর্তিটারও তাই। আমাদেরকে দেখতে পেয়ে একটা শেয়াল মন্দিরের বারান্দা থেকে হুশ করে কেটে পড়ল জঙ্গলের দিকে। সামনে যেতেই দেখতে পেলাম মায়ের মূর্তিটা পাথরের তৈরি। এক হাতে নিজের কাটা মুণ্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মা। মূর্তিটার দিকে তাকাতেই ভেতরটা কেমন যেন ছমছম করে। আমি চারদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম। তন্নবি পিছন থেকে এসে আমার হাতে এক টুকরো মিঠাই আর একটা কলা দিয়ে বলে, ‘ওই দিকটায় চল ওখানে বসার জায়গা আছে।’
একটা দৈত্যাকার পাথরের উপর বসি আমরা। এখান থেকে জঙ্গলটা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। কোনদিন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম এমন জঙ্গলের পাদদেশে কোনও এক প্রাচীন মন্দিরের নিকট এক রাজকন্যার সঙ্গে বসে থাকব ? আজকে লাল পাড় সাদা শাড়িতে পাখিটিকে আরও বেশি করে সুন্দর দেখাচ্ছে। ঠিক যেন প্রকৃতি কন্যা। এমন মুহূর্ত গুলোকে প্রাণপণ চেষ্টায় আটকে রাখতে ইচ্ছে করে। মাত্র দুবারের দেখায় তন্নবিকে এতটা আপন বলে মনে হত না, যদি না এখানের প্রকৃতি এতটা সুন্দর হত। ও আনমনে দোয়েল দুটোর দিকে উদাসীন ভাবে তাকিয়ে আছে। আজকে ওর দিকে তাকালেই কেমন যেন নেশা ধরে যাচ্ছে বারবার। আজকে পাখি সৌন্দর্যের সীমা পার করে গেছে। পাতা ঝরা হেমন্তের আদুরে বাতাস মাঝে মাঝেই ওর শাড়ির ভেতর ঢুকে লাল ব্লাউজ স্পর্শ করে যাচ্ছে। এমন সময় পুরুষ বুকের ভেতর সবারেই হয়তো কেমন কেমন যেন একটা হয়। সেটা কাম না প্রেম আমার জানা নেই। তবে আমার ভেতরে যে কিছু একটা হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি। আমরা দুজনেই নীরব ভাষায় কথা বলে যাচ্ছি। কিছুই শোনা যাচ্ছে না অথচ সব বোঝা যাচ্ছে।

দেখতে দেখতে আরও কয়েকটা দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। প্রকৃতির নিয়মে হঠাৎ  করেই শরতের পাখিটিও এসে বসেছে আমার জীবনের ডালে। এখন কাজের ভিড়েও ডুব মারতে শিখেছি। এখন প্রতিদিন আমার কাছে মানসিক ভ্যালেন্টাইন ডে। মিলের কুলি কামিনরাও দেখেছে আমাদেরকে এক সঙ্গে ঘুরতে। কিছু বলেনি ওরা, শুধু মুচকি মুচকি হেসেছে। ও হাসির অর্থ আমি বুঝি। হয়তো তন্নবিও বোঝে। কিন্তু সব বোঝার পরেও কিছু না বোঝা ইচ্ছে করেই রেখে দিতে হয়। তাই তো তন্নবির হাতে হাত রেখে বলতে পারিনি একটা জীবন একসঙ্গে বাঁচার গল্প। ও যে মালিকের মেয়ে এটুকু অস্বীকার করতে পারি না আমি কিছুতেই। কেবল মাত্র এই অদৃশ্য বেড়াজালটার জন্যেই আমি পাখির দিকে এগিয়ে যেতে পারি না। তন্নবি বারবার শুনতে চেয়েছে আমার মুখ থেকে কয়েকটা শব্দ। কয়েকটা অক্ষর। যে অক্ষর গুলো আমি বলতে পারব না হয়তো কোনদিন। যত দিন পেরিয়েছে তন্নবি ততই অস্থির হয়েছে আমার মুখ থেকে ভালবাসার গল্প শোনার জন্য। কিন্তু কেউ না জানুক আমি তো জানি সব ভালবাসার গল্প শোনানোর জন্য নয়। কিছু ভালবাসার গল্প একান্তই নিজের জন্য। এমন কী তার জন্যেও নয় যাকে মন ভালবেসেছে। আমার তন্নবির সঙ্গে ঘুরতে ভাল লাগে, আমি ঘুরি। তন্নবির দিকে চাইতে ভাল লাগে, আমি চাই। কথা বলতে ভাল লাগে, আমি কথা বলি। ভালবাসতে ভাল লাগে, ভালবাসি। ওকে হারানোর কথা ভাবতে যে ভাল লাগে না তাই তো ওকেও বলিনি, ‘তোমায় ভালবেসে ফেলেছি শরতের পাখি।’ থাক না এই না বলা ভালবাসাটুকু আমার নিজের ভেতরেই।
আরও কয়েকটা দিন পরেই বুঝলাম, ভালবাসাকে নিজের ভেতরে ভেতরে লালিত করে যাওয়া বড় সহজ কথা নয়। সে মাঝে মাঝেই মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের ইচ্ছায়। আজকে সকালে এসেই তন্নবি বলল, ‘আজকে বাবা ঝাড়গ্রাম গেছে। ফিরতে ফিরতে সেই রাত হবে। চল আজকে জোড়বাঁধ থেকে ঘুরে আসি। বাড়িতে বসে বসে আর মোটেই ভালো লাগছে না।’ আমাকে হাঁ না কিছু বলার সুযোগ দিল না তন্নবি। আমার হাত ধরে টেনে বার করল বাইরে। তারপর বলল, ‘যাবে না আমার সঙ্গে ?’ ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ‘না’ বলার শক্তি সাহস কোনটাই আমার নেই। 
তন্নবি ভালো মতোই জানে আমিও ওর সাথে যেতে চাই অনেক অনেক দূরে কোথাও যেখানে এমন সবুজ থাকবে যেখানে প্রকৃতি এমন ভাবে হাতের মুঠোয় এসে ধরা দেবে। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোন দের কথা মনে পড়লেই আমি তন্নবির সুরে সুর মেলাতে পারি না। পাদুটো কেমন যেন থরথর করে কাঁপে। তখন আমি ভয় পেয়ে যাই। ছাপোষা বাঙালী ঘরের প্রতিটা ছেলে যে ভয় পায় সেই ভয়টা আমাকেও জাপটে জড়িয়ে ধরে। তখন আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে, ‘না আমি পারব না। কিছুতেই পারব না।’ কিন্তু  পাখি যখন শিশ দিতে দিতে ডাকে ? আমি তখন মন্ত্রমুগ্ধের মতো পিছু পিছু উড়তে থাকি। তখন কোনও পিছুটান থাকে না। তখন ডালে ডালে পাতায় পাতায় পাখির সাথে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
জোড়বাঁধের কাছাকাছি গিয়ে আমরা দুজনে একটা পাথরের উপর বসি। জল আটকে রাখার জন্য যে বাঁধনটা দেওয়া হয়েছিল সেটার একটা দিক ভেঙে ঝুলে পড়েছে নীচের দিকে। ওই ভাঙা অংশটা দিয়েই কলকল করে নীচে নেমে যাচ্ছে জলের ধারা। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। অনেক দূরে ঠিক যেখানে শাল কাজুবাদামের জঙ্গল দিগন্ত রেখার সঙ্গে মিশেছে সেখানে যেন কেউ পাহাড়ের বেড়া দিয়ে রেখেছে। কিছুটা দূরেই জোড়বাঁধের জমা জলের উপর কয়েকটা বুনোহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে আপন মনে।
তন্নবি পাথরটা থেকে নেমে আমার সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর দুহাত দিয়ে আমার দুহাত ধরে টেনে আমাকেও পাথরটা থেকে নামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আমি আর আরামবাগ যেতে চাই না। আমি তোমার কাছে কাছে থাকতে চাই। সারাজীবন এমন করে ঘুরে বেড়াতে চাই। আমি বাঁচতে চাই পার্থ।, আমার মা বাবার মতো করে নয় আমি নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। তুমি আমাকে ফিরিয়ে দেবে না তো পার্থ! বল না ফিরিয়ে দেবে না তো?’ কথা গুলো এক নিশ্বাসে শেষ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে তন্নবি। ওর চোখের জলের ছোঁয়া লাগে আমার বুকে। আমি কিছুই বলতে পারি না। ওর নরম পালকের মতো চুলে আমার ঠোঁট দুটোকে ডুবিয়ে রাখি। এক সময় আমার চোখ দুটোও জলে ভরে আসে। 

অনেকক্ষণ আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। একটা সময় তন্নবির দু’বুকের জোয়ারে আমার ঘর, আমার গ্রাম, আমার পরিবার কোথায় যেন তলিয়ে যায়। দুটো শরীর জুড়ে একটা ঝড় ওঠে। সেই ঝড়ের হাত থেকে আমরা কিছুতেই নিজেদেরকে বাঁচাতে পারি না। আমাদের শরীর জুড়ে থাকা বস্ত্রের আবরণ দমকা হওয়ায় কোথায় উড়ে যায়। ঝড়ের দাপটে আমরা তলিয়ে যাই গভীর থেকে আরও গভীরে। যখন ঝড় থামে তখন দূরের একটা কাজুবাদাম গাছের পাতার ফাঁকে বসেথাকা হলদে রঙের ইষ্টিকুটুম পাখি শিস দিয়ে বলে, ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’ ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’  তন্নবি আমার চোখের দিকে একবার তাকিয়েই লজ্জাবতী লতার মতো আবার আমার বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে বলে, ‘অসভ্য পাখি একটা লুকিয়ে লুকিয়ে সব দেখেছে, ছিঃ।’ আমি তন্নবির খোলা পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলি, ‘আমার আবার কেমন কেমন ইচ্ছে হচ্ছে যেন।’ তন্নবি আমার খোলা পিঠে চিমটি কেটে বলে, ‘দুষ্টু কোথাকার। আমারও তো হচ্ছে।’  আমাকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে তন্নবি।
আমরা শালজঙ্গলের ভেতর দিয়ে খুনসুটি করতে করতে ফিরছিলাম। চাকুলিয়াতে আসার পর জীবনটা এমন করে পালটে যাবে ভাবতেই পারিনি। হঠাৎ করেই তন্নবির আমার জীবনে আসাটা যেন স্বপ্নের মতো। আজকে আমিও নিজেকে নতুন করে চিনছি। এই প্রথমবার আমি নিজেকে নিয়ে ভাবছি। শুধু মাত্র নিজেকে নিয়ে। তবে কী আমিও পাল্টে যাচ্ছি ? জানি না এটাকেই পাল্টে যাওয়া বলে কী না। তন্নবি আমার হাতে হাত রেখে পথ চলতে চলতেই বলে, ‘কালকে মা আসবে।’
মুহূর্তে আমার বুকে ভয়ের একটা বাতাস ধাক্কা দিয়ে যায়। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আগে বলনি কেন? এবার কী হবে ?’
-‘যা হবে ভালোই হবে।’ কথাটা বলেই আমার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে তন্নবি।
-‘মানে ?’
-‘আমি মাকে তোমার কথা বলেছি।’
-‘তাহলেই মরেছে।’ কথাটা বলেই ওর চোখের দিকে তাকাই। ওর চোখে এখনো নেশা লেগে আছে।
-‘মরেনি বুদ্ধুরাম বেঁচেছে। মাকে বলেছি বাবা আমাদের সম্পর্ক মনে হয় মেনে নেবে না। ব্যাস ওটা শুনেই মা বলেছে আমি তোদের বিয়ে দেবো দেখি তোর বাবা কেমন করে আটকায়।’
-‘কিন্তু তোমার বাবা তো কিছুই জানেন না।’
-‘কালকে জেনে যাবে। আসলে বাবাও মাকে মায়ের মতোই ভালবাসে। মা যখন রাজি হয়েছে তখন বাবা আর না বলবে না। আমাদের মিলন দিয়েই ওদের দ্বিতীয়বার মিলনের একটা রাস্তা খুলে যাবে। আমি চাই আমার বাবা-মা আবার ওদের হারানো দিন গুলো ফিরে পাক। তুমি শুধু সাথে থেকো দেখবে এই শরতেই বসন্তের ফুল ফুটবে আমাদের সবার জীবনে।’
আমি তন্নবির কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলি, ‘তুমি তো শরতের পাখি হয়ে এসেছিলে আমার জীবনে। হেমন্তের বিকেলে উড়ে যাবে না তো ?’
তন্নবি আমাকে বুকে জড়িয়ে বলে, ‘উড়ে যাব বলে তো বাসা বাধিনি। আমি তোমার বুকে আজীবন ভ্যালেন্টাইন ডে-র মতো জেগে থাকব।’ এমন সময় পিছন থেকে পাখিটা আবার ডাকে, ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’ ‘কৃষ্ণ খোকা হোক’তন্নবি হাসতে হাসতে বলে, ‘বেহায়া পাখিটা পিছু নিয়েছে দেখো। খোকা না হওয়া পর্যন্ত ওর শান্তি নেই।’ তন্নবির সাথে আমিও হাসতে হাসতে চলতে থাকি। পাখিটা নিজের খেয়ালেই শিস দিয়ে যায়। ও আমাদেরকে যেন আজীবনের ভ্যালেন্টাইন পথ দেখাচ্ছে। 
                              [সমাপ্ত]
www.google.com
www.banglasahitya.online

Check Page Rank of your Web site pages instantly:

This page rank checking tool is powered by PRChecker.info service

মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০১৮

জানুয়ারী ৩০, ২০১৮

Under 19 cricket world cup খেলার ভেতর খেলা

  1. খেলার ভেতর খেলা

Cricket World Cup under 19

Under 19  cricket World Cup এর কথা ভেবে প্রকাশ



‘যাব না মানে ? আলবাত যাব। ওদের টিমের সর্বনাশ না দেখা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। আমরা খেলব না তো কী হয়েছে ? আমরা মজা লুটব। কিছু বুঝলি রে ভজা। ছাড় তোর না বুঝলেও চলবে, তুই শুধু বিকেলে সাইকেল নিয়ে রেডি থাকিস। আপাতত আমি বাড়ি গেলাম। বিকেল চারটে কিন্তু, মনে থাকে যেন।’ একনাগাড়ে কথাগুলো বলেই চলে গেল পল্লব। 
খেলা দেখতে যাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই ভজার। ফালতু ঝগড়া মারামারি ছাড়া যে কিছুই হবে না সেটা ভজা ভাল মতোই জানে। কিন্তু উপায় কী! খেলা দেখতে না গেলে পল্লব ভজাকে পাড়ার টিমেই রাখবে না। তাই ইচ্ছে না থাকলেও যেতে তাকে হবেই।
তারাপুর গ্রামের দুটো পাড়া।  cricket, ফুটবল, কাবাডি যাই হোক না কেন এই  দু’পাড়ার শত্রুতা রক্তের ভেতর দিয়ে প্রতিটা প্রজন্মেই চলে আসছে। শুধু খেলাতেই নয়,- রাজনীতি, অর্থনীতি, চাষবাস থেকে শুরু করে দুর্গাপূজা কালীপূজার বিসর্জন এমনকি লেখাপড়া, ছবি আঁকা কোনও কিছুতেই কোনও পাড়া এক ইঞ্চিও পিছিয়ে থাকতে নারাজ। যদিও এখন আগের মতো রক্তারক্তি হয় না কিন্তু বাজি ফাটানো বিজয় উৎসব মানানো এসব এখনো নদীর স্রোতের মতোই বহাল তবিয়ত আছে দুটো পাড়াতেই। একটা পাড়া দশ ফুটের দুর্গা মূর্তি করলে আরেক পাড়া বার ফুটের কালী বানাবে। বিসর্জনে এক পাড়া পাঁচটা বক্স বাজালে অন্য পাড়া সাতটা বাজাবে। এই তারাপুর গ্রামের মানুষেরাই বলে ওদের রক্তে শত্রুতা আছে। যা কোনওদিনেই মিটবে না। এই প্রজন্মের ভজা পল্লবরা তো জানেই না কবে কখন কীভাবে এই শত্রুতা সৃষ্টি হয়েছিল তবুও নিজের অজান্তেই তারাও শত্রুতার স্রোতে ভেসে চলেছে এখনো।
সময় মতো চারটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ভজা। পল্লবরা হয়তো স্কুল মাঠের সামনেই দাঁড়িয়ে থাকবে। শুধু পল্লবরাই নয় পাড়ার অনেকেই আজকে খেলা দেখতে যাবে জয়পুরে। প্রতি বছরের মতো এবারেও জয়পুর গ্রাম ‘সুজন স্মৃতি  cricket’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল। আজকে তার ফাইনাল ম্যাচ। এবছর পল্লবদের টিম অংশগ্রহণ করেনি। এদিকে তারাপুরের নামো পাড়ার সঞ্জয়দের টিম ফাইনালে উঠেছে। এই পাড়ার কেউ চায় না সঞ্জয়রা আজকের ম্যাচ জিতুক। পল্লব ভজারা আজকে সমর্থন করবে ‘ছাতনা চণ্ডীদাস cricket ক্লাব’-কে। 
বিকেল পাঁচটা নাগাদ ম্যাচ শুরু হবে। ভজা, পল্লব, রাজেশ সবাই এসে পৌঁছেছে সাড়ে চারটা নাগাদ। ওরা এখন ঘুরে-ঘুরে আবহাওয়াটা বোঝার চেষ্টা করছে। কেউ বলছে তারাপুর মনসা মাতা ক্লাব, কেউ বলছে ছাতনা চণ্ডীদাস। গত বছর এই মাঠেই ফাইনাল খেলেছিল তারাপুর মনসা মাতা ক্লাবের সাথে ভজাদের ‘তারাপুর নবীন সিংহ’ ক্লাব। কুড়ি ওভারের খেলায় একশ একাশি রান বানিয়েছিল পল্লব ভজাদের টিম। সঞ্জয়, ভৈরব, দীপক ওরা বানাতে পারেনি এই রানটা। উনত্রিশ রানে হেরেছিল। দেখার মতো বিজয় উৎসব হয়েছিল। চকলেট বোম থেকে শুরু করে জয়ঢাক কিছুই বাদ দেয়নি পল্লবদের পাড়ার লোক। খেলার মাঠে চকলেট বোম ফাটাতে ফাটাতে উত্তেজনায় কেউ খেয়াল করেনি কখন জয়পুর গ্রামের এক খড়ের চালায় আগুন লাগিয়ে ফেলেছিল। তার জেরেই এই বছর পল্লব ভজাদের টিমকে খেলায় অংশ নিতে দেয়নি জয়পুর। অনেক চেষ্টা করেছিল পল্লবরা, কিন্তু চিঁড়ে ভিজেনি। তবে জয়পুরের ক্রিকেট কমিটি বলেছিল পল্লবদের টিমের ছেলেরা অন্য টিমের হয়ে খেলতে পারে। কিন্তু কেউ নেয়নি ওদেরকে। তাই আজকে পল্লব ভজা সবাই নিছক দর্শক মাত্র।
[দুই]
টসে জিতে ব্যাট নিয়েছে, তারাপুর মনসা মাতা ক্লাব। আজকে ক্যাপ্টেন সঞ্জয়ের সাথে ওপেনিং করতে নেমেছে রাহুল। এটা সাধারণত দেখা যায় না। সঞ্জয়ের সাথে বিক্রম বরাবর ওপেনিং করে আসছে। এই পরিবর্তনের কারণটা ঠিক কারুরই তেমন বোধগম্য হল না। সার্কেলের ছয় ওভারের জন্য অবশ্য হতে পারে। কারণ রাহুল বড়-বড় ছয় মারার জন্যই বিখ্যাত। এখন ওদের গেম-প্ল্যান যাই হোক সেটা বুঝে আমাদের লাভ নেই। আমরা বরং খেলাটা উপভোগ করি।
খেলা শুরু। প্রথম ওভারের প্রথম বল করতে ছুটে আসছে ছাতনার লাল্টু ঘটক। উইকেট নেওয়া কিংবা রান কম দেওয়ার দিকে লাল্টুর নজর থাকে না। ওর নজর ব্যাটসম্যানের শরীরের দিকে। ব্যাটসম্যানকে আহত করে মাঠের বাইরে ফেরাতে পারলেই যেন ও বেশি খুশি। যাই হোক লাল্টুর প্রথম বল কেমন ভাবে সঞ্জয় ফেস করবে সেটাই দেখার। না, কোনও রান হল না। বলটি সঞ্জয় মাথা নামিয়ে খুব সুন্দর ভাবে ছেড়ে দিল। এবার দ্বিতীয় বল করার জন্য প্রস্তুত লাল্টু। অসাধারণ ড্রাইভ! একদম লাল্টুর পাশদিয়ে সোজা বাউন্ডারি। তৃতীয় বল, আহত চিতার মতো ছুটে আসছে লাল্টু… ও-য়া-ও হোয়াট এ সিক্স ! পয়েন্টের উপর দিয়ে ছয়। প্রথম ওভারেই এমন ছয় ভাবা যায় না কিন্তু।
খেলা জমিয়ে দিয়েছিল সঞ্জয় আর রাহুল। প্রথম চার ওভারেই একান্ন রান কোনও উইকেট না হারিয়েই। পল্লব ভজাদের তো মুখ চুন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পলাশের একটা ওভার খেলার হাওয়াটাই বদলে দিল। পঞ্চম ওভারের বল করতে এসে পলাশ কোনও রান না দিয়েই তিন তিনটি মূল্যবান উইকেট তুলে নিয়েছে।এরপর পল্লব ভজাদের আর পায়কে। ওরা তো অলরেডি আবির মাখামাখি শুরু করে দিয়েছে। এদের দেখলে সবাই এটাই ভাববে, ম্যাচ হেরে গেছে সঞ্জয়রা। 

আরে গুরু এই তো শুরু আগে আগে দেখো হোতা হ্যে কেয়া। লেকিন ইয়ে কেয়া হুয়া ? ইয়ে বিলকুল নাহি হোনা চাহিয়েথা। এক রানের জন্য ছুটেছিল সঞ্জয় আর নিতাই। রানটাও কমপ্লিট হয়েছে আর ঠিক এমন সময় ফিল্ডারের থ্রো এসে লাগল সঞ্জয়ের নাকে। কিন্তু এটা তো সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃত ! আরে... কেউ কোনও প্রতীবাদ করল না! 
রক্ত ঝরছিল সঞ্জয়ের নাক দিয়ে। ওকে স্ট্রেচারে করে তুলে নিয়ে গেল জয়পুরের ক্রিকেট কমিটি। কিন্তু একি ! পল্লব ভজারা নাচানাচি বন্ধ করল কেন ? ওদের পাড়ার লোকেরাও চুপচাপ। ওদের তো আবার বেশি করে নাচা উচিৎ। সঞ্জয় বাইরে মানেই তো অর্ধেক সৈন্য কুপোকাত। সোজা ভাষায় এটাই দাঁড়াল, মারাদোনা গেল এখন শুধু চারাপোনা গুলো পড়ে আছে।
[তিন]
তের ওভারে পাঁচ উইকেট হারিয়ে মনসা মাতা ক্লাবের রান সংখ্যা দাঁড়িয়েছি একাশি। সঞ্জয়ের নাক দিয়ে এখনো রক্ত ঝরছে। ও ফিল্ডিং করতে নামতে পারবে বলেও মনে হচ্ছে না। তারমানে হিসেব দাঁড়াল ছয় উইকেট। সঞ্জয় শুধু ব্যাট নয় বোলিংও দারুণ করে। আজকে আর কোনও আশা দেখছি না মনসা মাতা ক্লাবের জন্য। ছাতনার দর্শকগুলো এক সুরে চিৎকার করে যাচ্ছে, ‘অবস্থা তোদের নেড়ি কুকুর নামের তোরা তারাপুর।’ পল্লবরাও হয়তো সঞ্জয়দের এমন করুণ দশা কল্পনা করেনি। এখন তো মনে হচ্ছে একশ রানের আশেপাশেই সঞ্জয়দের টিম বান্ডিল হয়ে যাবে।
চৌদ্দ ওভারের পঞ্চম বল করার জন্য ছুটে আসছে লাল্টু। এটাই লাল্টুর শেষ ওভার। বলটা কোনও রকমে ব্যাটে লাগিয়েই ছুটল রঞ্জন, মাত্র এক রান। এবার লাল্টুর লাস্ট বল, ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে বুবাই। লাল্টু তার লাস্ট বলটা সাধারণত উইকেট আর পায়ের মাঝে করার চেষ্টা করে। এটা বুবাইও ভাল মতোই জানে। যেমন গতিতেই আসুক না বলটা, বুবাইকে উইকেট বাঁচাতেই হবে। ওহ্ নো... গতিশীল বাউন্সার! বুবাই কিছু বোঝার আগেই বলটা এসে ওর ডান কানে লেগেছে। আরে আরে পড়ে গেছে বুবাই। খুব জোর লেগেছে ছেলেটার। সব শেষ। এখন অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনও রাস্তাই নেই তারাপুর মনসা মাতা ক্লাবের হাতে। যে জোনাকিটা নিয়ে সামান্য আলোর আশা ছিল সেটাও নিভে গেল... 

কিন্তু এরপর যা ঘটল তা হয়তো বহু বছর পরেও লোকমুখে প্রচলিত থাকবে। বুবাই আহত হয়ে ফিরে আসার পর কে নামবে সেটা নিয়ে আলোচনা করতেই একটু দেরি হচ্ছিল। এমন সময় ছাতনার ক্যাপ্টেন সমির ছুটে এসে সঞ্জয়ের টিশার্টের কলার ধরে তুলে গর্জন করে উঠল, ‘তোদের তারাপুর কুকুরের দম শেষ ? নামা, নামা। আমার টিমের বলারগুলো তোদের রক্তের জন্য অপেক্ষা করছে। কালাপাহাড়ির মাঠে কী বলেছিলি ? তারাপুরের সবাই সিংহ ? তোরা শেয়াল মারিস না? আজকে পরীক্ষা হয়ে যাক কারা শেয়াল। তোদের বাবা-কাকারা থাকলে তাদেরকে ডাক। আজকে দেখি কেমন তোদের বাঁচাতে…’ কথাটা শেষ হবার আগেই চার-পাঁচ হাত দূরে ছিটকে পড়ল সমির। পিছন থেকে পল্লব এসে ওর কোমরে এক লাথ মেরেছে। সবাই অবাক। যে সঞ্জয়দের নাম শুনলে পল্লবরা হিংসার দাবানলে জ্বলে ওঠে, আজকে যাদের বিনাশ দেখতেই এসেছে আবির নিয়ে। শেষে তাদের জন্যেই… 
[চার]
সঞ্জয়ের পাশে পড়ে থাকা ব্যাটটা নিয়ে কাউকে কিছু না বলেই মাঠে নেমে পড়ল পল্লব। সারা মাঠ নীরব। সাবাই হাঁ করে দেখছে পল্লব মনসা মাতা ক্লাবের হয়ে ব্যাট করতে নামছে। নিজের চোখকেই যেন কারু বিশ্বাস হচ্ছে না। সমির তখনো ওমনি ভাবেই পড়ে আছে। ওর ঘোর কাটতেই চাইছে না কিছুতেই। হঠাৎ শুরু হল হাততালি, তারাপুরের দুটো পাড়াই উঠে দাঁড়িয়ে পল্লবকে সম্মান দিল। আজকে আর কোনও পাড়া নেই আজকে তারাপুর নেমেছে ছাতনার বিরুদ্ধে। সঞ্জয়ের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। যে পল্লবকে ও নিজের জীবনের একমাত্র শত্রু বলে মনে করত সেই পল্লবেই আজকে ওর সম্মানের জন্য তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে। ইতিহাস সাক্ষী আছে যেদিন পল্লবের ব্যাট কথা বলে সেদিন বিপক্ষের পরাজয় নিশ্চিত।
পল্লব নামার পরেই মাঠের প্রকৃতিটাই যেন পালটে গেল। পনের ওভারের প্রথম বল থেকেই শুরু হল লঙ্কাদহন। রানের গতিতেও জোয়ার এসে গেল। পল্লবের ব্যাট ঠোকার আওয়াজ, ছয়ের সাইজ আর চারের গতি দেখে ফেটে পড়ল তারাপুরের দর্শক। 

বিধাতা হয়তো খুব একটা খুশি হননি ব্যাপারটাতে নতুবা সতের ওভার চার বলে পল্লব স্ট্যাম্প আউট হত না। তারাপুর শেষ পর্যন্ত একশ আটষট্টি রানে থামল। পল্লব মাত্র এগারটি বল খেলে আটচল্লিশ রান বানিয়েছে। ছয়টি ছক্কা তিনটি চার। পল্লব ফিরলে ভজা নেমেছিল, ওর রান সংগ্রহ তেইশ নট আউট।
এবার শুরু হল দ্বিতীয় ইনিংস। আঘাতকে উপেক্ষা করেই সঞ্জয় বল করার জন্য প্রস্তুত। সামনে দাঁড়িয়ে উমাপদ। প্রথম বলটা পড়ার পরেই একটু ঝাঁপিয়ে গেল উমাপদর দিকে। পুল করার চেষ্টা করেও কোনও লাভ হল না। বলটি সোজা উইকেট রক্ষক কার্তিকের হাতে। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বলেও কোনও রান করতে পারল না উমাপদ। কিন্তু চতুর্থ বলটি সোজা পল্লবের মাথার উপরদিয়ে উড়িয়ে দিল ছয় রানের জন্য। পঞ্চম বলটিও একেই পথে পল্লবের মাথার উপর দিয়েই ছয়। লাস্ট বলে কোনও রান নেই। প্রথম ওভারের শেষে ছাতনার রান বার। কোনও উইকেট না হারিয়েই। 

দ্বিতীয় ওভার করার জন্য সঞ্জয় নিজেই ভজার হাতে বল তুলে দিল। দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে অনির্বাণ এক রান নিয়ে আবার উমাপদকেই ভজার সামনে খাড়া করে দিল। দ্বিতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে কোনও রান না পেয়ে তৃতীয় বলটি ছয় মারার জন্য উড়িয়েছিল উমাপদ কিন্তু সেটি সোজা থার্ডম্যান বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে থাকা কৈলাশের হাতে। আউট হয়ে ফিরতে ফিরতে উমাপদ কিছু একটা বলল ভজাকে, ভজাও তেড়ে যাচ্ছিল উমাপদর দিকে কিন্তু সঞ্জয় এসে ভজাকে সামলে নিল।
দেখতে দেখতে শুরু হল প্রচণ্ড উত্তেজনা। প্রতিটা বলেই খেলার রূপ পালটে যাচ্ছে। সঞ্জয়, ভজা দুজনেরেই এক ওভার করে বাকি। প্রথম ওভারের দুটি বলে দুটি ছয় খেলেও পরের দুটি ওভার সঞ্জয় ঠিক বোলিং করেছে। শুধু তাই নয় অনির্বাণের উইকেট ছিটকে দিয়েছিল পাঁচ হাত। ভজাও তিন ওভারে পঁচিশ রান দিয়ে পেয়েছে দুটি উইকেট। আজকে বরং নিম্ন মানের বোলিং করেছে সুশান্ত-অমৃতরা। বাকি দুটি উইকেট ভৈরব পেয়েছে।     
[পাঁচ]
সতের ওভার শেষে ছাতনার রান একশ বত্রিশ পাঁচ উইকেটের বিনিময়ে। অর্থাৎ আঠার বলে সাইত্রিশ রানের দরকার। আজকের ক্রিকেটে এটা তেমন কোনও ব্যাপারেই নয়। তাছাড়া ছাতনার ক্যাপ্টেন সমির এখনো ব্যাট হাতে পিচে দাঁড়িয়ে। কোন টিম ম্যাচ জিতবে এখন বলা অসম্ভব। দেখা যাক পরের ওভার সঞ্জয় নিজেই আসে না ভজাকে শেষ করিয়ে দেয়।
না নিজেই বল করার জন্য এগিয়ে এসেছে সঞ্জয়। অতএব লাস্ট ওভার হয়তো ভজার হাতেই তুলে দেওয়া হবে। কিন্তু এটা কী হল! সঞ্জয় বল হাতে নিয়ে ছুটে আসতে আসতে দাঁড়িয়ে পড়ল কেন ? হে ভগবান, সঞ্জয়ের নাক দিয়ে প্রচুর আবার রক্ত ঝরছে তো। না, না এই অবস্থায় ওর পক্ষে বল করা একদম অসম্ভব। আবার মাঠ ছাড়তে হল সঞ্জয়কে। তারাপুরের জন্য এটা একটা ভয়ংকর সমস্যা হয়ে দেখা দিল। সুশান্ত প্রচুর মার খেয়েছে ওকে আর বল করতে দেওয়া ঠিক হবে না। অমৃত কিংবা শঙ্কর কেও আজকে বোলিং ভাল করেনি। এখন কোনও উপায় নেই অমৃতের হাতেই বল তুলে দিতে হবে।
না খুব একটা রান দেয়নি অমৃত। মাত্র বার রান। অমৃতের কাছে ছাতনা হয়তো পনেরোর বেশি আশা করেছিল। এবার ছাতনার চাই দু’ওভারে পঁচিশ রান। মাত্র সাড়ে-বার করে। উনিশ ওভারটি ভৈরবকেই করানো উচিৎ। হাঁ, ভৈরবেই এসেছে। উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। ওভারের প্রথম বলেই লম্বা মাপের ছক্কা। হে ভগবান! ডুবিয়ে দিল ভৈরব। দ্বিতীয় বলে, আবার……র ছয়। সমির আম্পায়ারকে ঈশারা করে আবার ছয়ের জন্যই হাত তুলতে বলল। তারমানে তৃতীয় বলেও ছয় মারবে নাকি! যা বলা তাই করা, আবারররর... না, না , ছয় নয় ছয় নয় সোজা পল্লবের হাতে... হাতে... হাতে, ইয়েস। আরে শাবাশ মেরে শের। পল্লব ক্যাচটা নেওয়ার পর বলটা পায়ে করে পিটে আবার সমিরের দিকেই পাঠিয়ে দিল। সমির আউট হবার আনন্দে সঞ্জয় আবার মাঠে নেমে পড়েছে। না, এখন আর নাকে রক্ত পড়ছে না। 
ভৈরবের ওভারের শেষ বলে আবার একটি চার। ছাতনাকে জিততে হলে আর মাত্র নয় রান দরকার। তারাপুরকে জিততে হলে রান দেওয়া চলবে না। আবার আরও একটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে মাঠে। কে করবে শেষের ওভার, সঞ্জয় না ভজা ? উত্তর জানার জন্য… না, না উত্তর জানার জন্য কোনও নম্বরে S.M.S বা কোথাও Login করতে হবে না। এখুনি জানা যাবে লাস্ট ওভার বল করে কে ম্যাচ জিতিয়ে হিরো বা ম্যাচ হারিয়ে ভিলেন হবে।
সঞ্জয়, হাঁ সঞ্জয় নিজেই বল করার জন্য প্রস্তুত। যে কারণেই হোক না কেন সঞ্জয় ভজার হাতে বল তুলে দিতে পারল না। এক পা এক পা করে ছুটে আসছে সঞ্জয়। টান টান উত্তেজনা দু’পক্ষেই। একি, আবার সঞ্জয় দাঁড়িয়ে পড়ল কেন! না, সঞ্জয়ের নাকে রক্ত পড়ছে না। সঞ্জয় হাত নাড়িয়ে ডাকল ভজাকে তারপর ওর হাতেই বল তুলে দিয়ে কাঁধ চাপড়ে বেস্ট অফ লাক জানিয়ে ফিল্ডিং করার জন্য ছুটল বাউন্ডারি লাইনে।
চিৎকারে কানে তালা লাগার জোগাড় এই পক্ষ চেঁচাচ্ছে উইকেট তো ওই পক্ষ চেঁচাচ্ছে সিক্স। লাস্ট ওভারের প্রথম দুটি বলে কোনও রানেই হল না ছাতনার। তৃতীয় বলে দু…ই না না তিন... তিন... হাঁ তিন। চতুর্থ বলে কোনও রান নেই। পঞ্চম বলে সোজা চার। উত্তেজনায় হৃৎপিণ্ড মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। এক বলে দুই রান করলে ছাতনা জিতে যাবে।
লাস্ট বল, ভজা দুরন্ত গতিতে ছুটে আসছে বোলিং স্ট্যাম্পের দিকে। ছাতনার রমেন খেলবে শেষ বলটি। বল আশা মাত্রই উড়িয়ে দিয়েছে রমেন। বলের নিচে ক্যাচ নেবার জন্য ছুটে আসছে সুশান্ত, আরে আরে এটা তো পল্লবের হাতের ক্যাচ। দুজনের ধাক্কা হলেই সব আশা শেষ। এই গেল গেল গেল ধুসসস… সুশান্তর হাত থেকে ক্যাচ ফসকে গেছে। ওকি বল হাতে নিয়ে পল্লব আবার ছুটছে কেন। এইরে মারপিট হল বলে। তারাপুরের সবাই ছুটছে মাঠের দিকে। আবিরে আকাশ লাল হয়ে যাচ্ছে। দুর্গা ভাসানের মতো ঢাকের আওয়াজ। আমি একলা তাজ্জব হয়ে দাঁড়িয়ে, কী যে হল ব্যাপারটা বুঝতেই পারলাম না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক বুড়োকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাদু কী হল সবাই ছুটছে কেন?’ দাদু ফোকলা দাঁতে একগাল হেসে বলল, ‘আলে আমলা দিতে গেতি।’ 
‘কী করে জিতলে ক্যাচ তো মিশ হয়েছে।’ 
ভদ্রলোক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ধুল বাবা এলা কেন খেলা দেকতে আতে ভগবান দানে। তুমি কী কানা নাকি ? দেকতে পেলে না। সুতান্তর হাত থেকে বলতা পলার সময় পল্লব কেচতা নিল। দেকতে পাওনি!’ বিরক্ত হয়ে ভদ্রলোকটিও মাঠের দিকে হাঁটা লাগালেন। আমিও আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। 


সত্যিই চিরশত্রু দুটো পাড়া কেমন ভাবে জীবনের আসল খেলায় এক হয়ে গেল। দুটো পাড়াতে সবার চোখের সামনেই একটা শত্রুতা বইছিল ঠিক কথাই কিন্তু সবার চোখের আড়ালে বইছিল অন্তরের টান। আজকে ছাতনা শুধু বারুদে আগুন দিয়েছিল, তাতেই অন্তরের টান আপনা আপনি বেরিয়ে পড়েছে। এটাই হয়তো সব খেলারই আসল প্রাপ্তি। তাই আজকে সারা তারাপুর জুড়ে উৎসব। আজকে পাড়া দুটো যেন এক আত্মার আত্মীয় হয়ে গেছে। পরের প্রজন্ম হয়তো বড়দের মুখে এই খেলাটার গল্প বারবার শুনবে।         
                                   [সমাপ্ত]

শনিবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০১৮

জানুয়ারী ২৭, ২০১৮

সম্পূর্ণ প্রেম ও প্রতিবাদের আগ্নেয় উপন্যাস, প্রমিথিউসের পথে

[সম্পূর্ণ উপন্যাস]

প্রমিথিউসের পথে
বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায়


গাড়িটা বিবড়দা পেরিয়ে সোজা ছুটতে লাগল শিবডাঙ্গা মোড়ের দিকে। দু’পাশে ঘন কাজুবাদামের জঙ্গল, মাঝে মাঝে টুকরো টুকরো পোড়ো জমি। জ্যোৎস্নায় ভেজা ঠাণ্ডা বাতাস একবার করে ছুঁয়ে যাচ্ছে তনুশ্রীর তন্দ্রা মাখা দেহটা। আজ আর তার কোনও পিছুটান রইল না। সুদূর ভবিষ্যতের নিকনো স্মৃতির উঠোনে দাঁড়িয়েই এবার তনুশ্রীকে দেখতে হবে মা বাবা আর ছোট বোন অনুকে। সম্পর্কের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম শেকড় গুলোকেউ তনুশ্রী ছিঁড়ে ফেলে এসেছে বাড়ির বারান্দায়। এখন দুচোখ জুড়ে শুধুই নতুন মাটির গন্ধ।  
‘তনু, তনু, এই তনু’- অনুপের মৃদু ডাকে তনু চোখের পাতা খুলতেই দেখতে পায়, দূরের কাজুবাদাম জঙ্গলটা সারিবদ্ধ ভাবে পেরিয়ে যাচ্ছে একটা হাতির পাল। সার্কাসে বেশ কয়েকবার হাতি দেখেছে তনু। ডিসকভারির মতো চ্যানেলে বহুবার হাতির পালও দেখেছে। কিন্তু চোখের সামনে এমন জলজ্যান্ত হাতির পাল দেখছে এই প্রথমবার। হাতি গুলো প্রকৃতির ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে গভীর জঙ্গলের দিকে। অন্যদিকে তাকানোর মতো সময়টুকুও ওদের নেই। অন্যদিন হলে হয়তো তনু ভয় পেয়ে যেত। আজকে তনুর ভয় করছে না। অনুপের বুকের কাছে মাথাটা এনে ফিসফিস করে তনু বলল, ‘আজ পৃথিবীর সব চেয়ে নিরাপদ বুকে আমি, আজ আর ভয় পাব না।’ 
অনুপ কিছু না বলে তনুর চুলে আঙুল চালাতে থাকে। গাড়িটা ডান দিকে একটু বাঁক নিতেই একটা দমকা পাহাড়ি হাওয়া তনুর চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যায়। অনুপকে আরও একটু জোরে জড়িয়ে, দুচোখ বন্ধ করে তনু খুঁজতে থাকে তিন মাস আগের সেই শ্রাবণী দিনটাকে।
বাসের জন্য তনু সেদিন অপেক্ষা করছিল তালডাংরা বাস স্ট্যান্ডে। কিন্তু সেদিন হঠাৎ কী একটা কারনের জন্য বাস ধর্মঘট হয়ে যাওয়ায় একটাও বাস আসেনি বাঁকুড়া থেকে। তনু সেদিন বাধ্য হয়েছিল অপরিচিত অনুপের মোটর বাইক চড়তে। সেদিন তনু নিজেও ভাবেনি কদিন পরই এই অপরিচিত ছেলেটাই চির পরিচিত হয়ে যাবে। আরেকবার চোখ তুলে তনু অনুপের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে। মুচকি হেসে আবার একই ভাবে শুয়ে পড়ে। সেদিনেই প্রথম বার অনুপকে দেখেছিল তনু। তারপর মাঝে মাঝেই অনুপকে দেখা যেত রাস্তায়। স্কুলের দরজার বাইরে। বাস স্ট্যান্ডে। যে কারনেই হোক না কেন তনুর বাসও আসত না মাঝে মাঝেই। তাই কোনওদিন রেস্টুরেন্ট কোনওদিন ইকোপার্কে দু’জনকে একসঙ্গে দেখা যেত। অনুপের ব্যাপারে কিছুই কাউকে বলেনি তনু। পাছে এক কান থেক আরেক কান হতে হতে কথাটা বাবা জেনে ফেলে। এই ভয়টাই ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত। তনুর বাবা বিক্রম চৌধুরী এলাকার নামকরা খড়িমাটির ব্যবসায়ী। সেই সূত্রে এলাকার প্রায় সকলেই কম বেশি চেনে তনুকে। তাই তনু অনুপের মোটর বাইকে চড়ার আগে ওড়নাতে পুরো মুখ ঢেকে নিত। তবুও একদিন ইকোপার্কের ভেতরেই ধরা পড়ে গেল গ্রামের এক দাদার কাছে। কথাটা বিক্রম বাবুর কানে ঢুকতে দেরি হয়নি। বাংলা সিনেমার নায়িকার মতোই প্রথমে তনুর কলেজ বন্ধ হল। তারপর মোবাইল কাড়িয়ে নেওয়া হল। মোটকথা অনুপের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়েছিল তনুর। তনুর মা তনুকে অনেক বুঝিয়ে ছিলেন। অচেনা ছেলে, দিন-কাল ভালো নয়, তোমার বাবার একটা সম্মান আছে। আরও কত কি। 
কিছুতেই কিছু হয়নি। মোবাইল না থাকলে কী হবে? তনুর ছোটো বোন অনু, মানে অনুশ্রী ঠিক পিয়নের কাজটা করেদিত। অনু না থাকলে হয়তো তনুর পক্ষে বাড়ির বাইরে পা ফেলাও সম্ভব হত না, বাড়ি ছাড়া তো দূরের কথা। আজকে সকালে অনুই অনুপের ফেসবুক মেসেজটা নিয়ে এসে দেখিয়ে ছিল তনুকে। বিকেলে ফর্ম ফিলাপের নাম করে পালিয়ে যাবার সুযোগটাও তো অনুই করে দিয়েছিল।
অনুপের বুকে মাথা রেখে আজকে কত জলছবিই না ভেসে উঠছে তনুর চোখের সাদা কালো পর্দায়। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়তেই ধড়-ফড় করে উঠে বসে তনু অনুপ কে জিজ্ঞেস করে, -‘ওই সেদিন বোনের ফেসবুকে যে বললে কি একটা গান শোনাবে আমাকে। কই শোনালে না তো?’ 
পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে করতে অনুপ ঠোঁট উল্টে বলে, -‘সবই তোমার মনে থাকে দেখছি।’
-‘বারে মনে থাকবে না কেন ?’ 
হালকা সাউন্ড দিয়ে অনুপ মোবাইলে গানটা বাজায়, ‘আজ ফাগুনী পূর্ণিমা রাতে চল পলাইয়ে যাই।’ 
গানটা শেষ হলে তনু বেশ খুশি হয়ে বলে, -‘বেশ সময় উপযুক্ত গানটা। তুমি কি আগাম জানতে আমরা ফাল্গুনের পূর্ণিমা রাতেই পালাব?’
মৃদু হেসে অনুপ হেঁয়ালির সুরে উত্তর দেয়, -‘আমরা না জানলেও সুরজিৎ হয়তো জানত। নতুবা এমন গান গাইবে কেন বলো ?’ 
-‘তোমার না সবেতেই ইয়ার্কি। বলো না তুমি কি আগেই পালানোর কথা ভেবেই রেখেছিলে?’
-‘না, ঠিক ভেবে রেখেছিলাম বললে ভুল বলা হবে। তবে যেদিন তোমার ফোন বন্ধ হল সেদিন থেকেই ভাবছিলাম সুযোগ পেলেই তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব।’
তনু কি একটা বলতে যাচ্ছিল কিন্তু ড্রাইভার একটা প্রশ্ন করতেই আর বলা হল না, -‘অনুপদা কিছু কেনার থাকলে এখানেই নিয়ে নাও। আর কোথাও দোকান খোলা পাবে না মনে হয়।’ অনুপ ড্রাইভারকে গাড়িটা সাইড করে লাগাতে বলে নেমে পড়ে রাস্তায়। তনু জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকে একটা দোকানে সাজিয়ে রাখা রঙিন আবিরগুলোর দিকে। লাল আবিরের উপর চোখটা পড়তেই কেমন যেন একটা অচেনা শিহরণ বুকের ভেতরটাকে সিক্ত করে দিয়ে যায়। খানিক পরে অনুপ কেক, বিস্কুট, পোড়া মাটির দুটো হাতি-ঘোড়া, আর খুব সুন্দর পোড়ামাটির এক জোড়া মালা নিয়ে ফিরে আসে। তনু কিছু বুঝতে পারার আগেই অনুপ একটা মালা তনুর গলায় পরিয়ে দিয়ে বলে, -‘জানো তনু বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির কাজের সৌন্দর্যের মতো সৌন্দর্য তুমি অন্য কোথাও পাবে না।’ 
তনু প্রাণ ভরে অনুভব করার চেষ্টা করে মাটির পুঁতি গুলোকে। ওরা যেন কত শতাব্দীর ইতিহাসের গল্প জানে। চৈতন্য সিংহ দেবের কথা। শ্যামরায় মন্দিরের কথা। লাল বাঁধের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা জোড়া মন্দির দুটোর কথা। রাজা রঘুনাথ সিংহের কথা। আরও কত কিছু।    
মারুতিটা এবার কাজুবাদাম জঙ্গলটাকে দু’পাশে ফেলে ছুটতে থাকে আরেক পৃথিবীর দিকে। গাড়ির ভেতরে মান্নাদের কণ্ঠে একটা গান বেজে চলেছে হালকা সুরে, ‘তুই কি আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে।’ ড্রাইভার কি ইচ্ছে করেই এমন একটা গান চালিয়েছে ? এই প্রশ্নের উত্তর তনুর জানা নেই। তবে গানটার সুরের হাত ধরে তনু পৌঁছে যায় তার বালিকাবেলা বিকেলের পুতুল খেলার একটা দিনে। কেবলমাত্র মেয়ের অভিমান ভাঙাতেই তনুর বাবা সেদিন জল-ঝড়কে তোয়াক্কা না করে দোকানে গিয়ে কিনে এনেছিল একটা মস্ত বড় পুতুল। হঠাৎ করে সেই দিনটার কথা মনে পড়তেই তনুর দু’চোখ কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে আসে। আর হয়তো বাবা মায়ের সাথে কোনও দিনেই তনুর দেখা হবে না। অনুপের কাঁধে মাথা রেখে তনু বাবার চওড়া কাঁধটা অনুভব করার চেষ্টা করে। না, দুটো কাঁধে কোনও মিল খুঁজে পায় না তনু। দুচোখ বন্ধকরে বালিকা বেলার সেই সব দিনগুলোতে হাঁটতে হাঁটতে একটা সময় তনু ঘুমের দেশে হারিয়ে যায়। 
এখনো সকালের আলো ফুটতে বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে। আর একটু পরেই পূবের আকাশে পাল তুলে নেমে আসবে নতুন দিনের আলো। অনুপ এখনো ঘুমিয়ে। গাড়িটা চলছে একটা কাঁচা রাস্তার উপর দিয়ে। পাশাপাশি তাকিয়েও অনু ঠিক আন্দাজ করতে পারে না কোন জায়গা এটা। গাড়িতে তেল ভরানোর সময় তনুর ঘুমটা ভেঙেছে। এখনো গাড়িটা চলচে সেই নিজের গতিতেই। যেন গাড়ি আর ড্রাইভারের কোনও ক্লান্তি নেই। ড্রাইভারটাও ভীষণ রকমের চুপচাপ। তনু জানেও না ওর নাম কি? বাড়ি কোথায়? একবার ভেবেছিল জিজ্ঞেস করবে। আবার কি ভেবে চুপ করে করে গেছে। গাড়ির শব্দ পেয়ে রাস্তার পাশের একটা পুকুর থেকে একদল বালিহাঁস সাঁই-সাঁই ডানার শব্দ তুলে উড়ে গেল পশ্চিম আকাশে। তনু দেখতে পেল অনেক দূরে কুয়াশার চাদরে শরীর ঢেকে ঘুমিয়ে আছে একটা পাড়াগ্রাম। সব যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে তনুর। ওর এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে ও চলেছে এক অচেনা সংসারে জীবনভর খেয়া দিতে।
অনুপের নিজের বলতে তেমন কেউই নেই এক মাসি ছাড়া। মা মারা গেছে ছেলে বেলাতেই। তখন অনুপ ক্লাস ফোর। অনুপের সম্পর্কে এর বেশি তেমন কিছুই জানে না তনু। অনুপ ছেলেটা দেখতেও বেশ সুপুরুষ। বেশ লম্বা। চওড়া ছাতি। আর যেটা তনুকে সব চেয়ে বেশি করে টানে তা অনুপের চোখ। যেন শত জীবনের করুণ গাঁথা আছে ওই দুটো চোখে। মাঝে মাঝেই ইকোপার্কের ঝিলের ধারে বসে তনু হারিয়ে যেত অনুপের চোখে। হয়তো অনুপের চোখ দুটোই তনুকে বাড়ি ছাড়ার সাহস দিয়েছে। নতুবা মাত্র তিন মাসের পরিচয়ে তনুর মতো মেয়ে এই কাজ করতেই পারত না। তনু আরেকবার তাকিয়ে দেখে অনুপের ঘুমন্ত মুখটা। ভোরের আলো অনুপের মুখে একটা শান্তির পর্দা নামিয়ে রেখেছে। মনে মনে তনু ভাবে, এর সাথেই তো সব পিছুটান ফেলে যাওয়া যায়। একটা মিষ্টি হাসির রেখাতে গালে টোল পড়ে তনুর। ক্লাস নাইন থেকে তনু যতগুলো প্রেমের প্রস্তাব পেয়েছে তাতে ওর হাসিটার একটা অবদান অবশ্যই ছিল। পৃথিবীর সব করুণ প্রেমের ছবিতে কোথাও না কোথাও হাসি একটা বিশেষ স্থান নিয়েই এসেছে। তনুর হাসিটাও বেশ হৃদয় শিকারি হাসি। তনুর যে অনুপের আগে কাউকে ভালো লাগেনি তা নয়। ক্লাস একাদশের মৈনাক পাত্র নামের একটা ছেলেকে তনুর বেশ ভালই লাগত। বইপোকা মৈনাকের নজর পড়লই না তনুর উপর। আজকে মৈনাকের কথা হঠাৎ মনে পড়তেই তনুর ঠোঁটে হাসিটা এসেছিল।
।।দুই।।

-‘না,না সুশান্ত আমি এই ব্যাপারে বিন্দু মাত্রও জানতাম না। এই কদিন আগে আমাদের পাড়ারই একটি ছেলে তনুকে ওই ছেলেটির সাথে পার্কে দেখে। তারপর আমাকে সব জানায়। আমি তনুর কলেজ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আর মোবাইলটাও দিইনি ওকে।’ -বেশ উত্তেজনার সাথেই কথাগুলো বললেন বিক্রম বাবু পুলিশ অফিসারবন্ধু সুশান্ত গাঙ্গুলিকে। 
-‘আরে ওটাই তো ভীষণ ভুল করেছিলি। কলেজ বন্ধ করে বা মোবাইল নিয়ে নিলেই কি আজকালের ছেলে-মেয়েদের আটকানো যায় ? বরং এই জন্যই ওরা পালানোর কথাটা ভাবল।’ 
-‘দেখ না ভাই যা হবার তাতো হয়েইছে। এখন কী করে তনুকে ফিরিয়ে আনা যায় সেই ব্যবস্থা কর।’ বিক্রম বাবুর চোখে মুখে একটা কান্নার ঝিলিক দেখা যায়। কাল সারারাত ঘুমোননি। সন্ধ্যা থেকে পাগলা কুকুরের মতো মেয়েকে খুঁজেছেন বিক্রম চৌধুরী। যখন কোথাও কোনও খবর পাননি তখন বাধ্য হয়েই ফোন করতে হয়েছে বন্ধু সুশান্ত গাঙ্গুলিকে। 
-‘এখুনি এত ভেঙে পড়িস না বিক্রম। ওরা বিয়ে করে ফেলার আগেই যদি ওদেরকে তুলে আনা যায় তাহলে পুরো ব্যাপারটাই আমাদের হাতেই থাকবে। কাল রাত থেকে তুই একবারও চোখের পাতা বন্ধ করিসনি। এখন একটু ঘুমোবার চেষ্টা কর। যা করবার আমি তো করছি।’
কিছুতেই শান্ত হতে পারছেন না বিক্রম বাবু। তনুর মা সুমিত্রা দেবী কাল রাতেই তিন বার মূর্ছা গিয়ে এখন একটু ঘুমিয়েছেন সবে। কালকে সন্ধ্যা থেকে হাজার প্রশ্নের ঝড় বয়ে গেছে তনুর বোনের উপর। না, অনু মুখ খোলেনি। ছোটবেলা থেকেই দিদি তার বান্ধবীর ভূমিকা পালন করে এসেছে। তাই দিদির অসময়ে অনুই পাশে দাঁড়িয়েছে আজ। বাবা-মায়ের বকুনি, পাড়ার লোকের হাজার প্রশ্ন, দিদি শূন্য ঘর, সব মিলিয়ে অনুর চোখের সাদা ভাগটা বসন্তের পলাশ রঙে রাঙিয়ে আছে। অনুপকে কয়েকবার ফোন করার চেষ্টাও করেছিল অনু কিন্তু মোবাইল সুইচ অফ থাকায় দিদির কোনও খবর পায়নি এখনও। একবার করে নানান দুশ্চিন্তার মেঘ ডানা মেলে উড়ে এসে জমাট বাঁধছে অনুর মনে, -‘অনুপদা দিদির সাথে খারাপ কিছু করবে না তো ? যদি দিদিকে…! না, না অনুপদা খুব ভালো মানুষ, খারাপ কিছু করতেই পারে না।’ -আবার আত্মসান্ত্বনা মাখা যুক্তির হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে মেঘ গুলো।
কয়েকটা বিষয় জানার জন্য সামান্য কিছুক্ষণের জন্য সুশান্ত গাঙ্গুলিকে বিক্রম বাবুর বাড়িতেই আসতে হয়েছিল। সুশান্ত গাঙ্গুলি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পর বিক্রম বাবু চোখের জল চেপে খোলা ছাদে এসে দাঁড়ান। হাতে একটা অনেক পুরানো দিনের স্মৃতিতে ভরানো পাণ্ডুলিপি। ছাদের থেকে খড়িমাটির স্তপ গুলো ছোটছোট পাহাড়ের মতো দেখা যায়। সূর্যের নরম আলোতে সাদা মাটিগুলোকে দেখে মনে হয় যেন ওরা লাল রঙ কুড়িয়েছে আঁজলা ভরে। দূরের লাল রাস্তাটার দিকে আনমনে চেয়ে থাকতে থাকতে বিক্রম বাবুর চোখ থেকে টুপ করে অ্যালবামের উপর এক ফোটা নোনাজল পড়ে। তনুর একটা ছবির উপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বিড়বিড় করে তিনি বলেন,-‘তোকে এতটা বিশ্বাস করে ছিলাম আর তুই এমন করলি! অনু হলে এত কষ্ট পেতাম নারে মা!’ 
অ্যালবামটাকে বুকে জড়িয়ে হু-হু করে কেঁদে ফেলেন বিক্রম বাবু। এমন সময় কাঁধে একটা নরম হাতের ছোঁয়া লাগে। বিক্রম বাবু পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন সুমিত্রা দাঁড়িয়ে আছে। বিক্রম বাবু চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করেন, -‘তুমি আবার অসুস্থ শরীরে উঠে এলে কেন?’ 
স্বামীর ভেঙে পড়া চোখের দিকে তাকিয়ে সুমিত্রা দেবী কিছুই বলতে পারেন না। এই অবস্থায় যে কোনও সান্ত্বনা বাক্যই কাজ করে না। ঠোঁটগুলো শুধু কাঁপতে থাকে নীরব অভিমানে। 
হঠাৎ করেই যেন চৌধুরী বাড়িতে একটা শুকনো ঝড় আছড়ে পড়ল। কেউ প্রস্তুত ছিল না এমন ঝড়ের জন্য।    

এদিকে সূর্যের কাঁচা হলুদ আলোয় অন্য আরেক জীবনে পা ফেলল তনু। জায়গাটা বেশ সুন্দর। চারদিক পলাশ ফুলে লাল হয়ে আছে। পশ্চিম দিগন্ত জুড়ে শুধু খোলা মাঠ। পূবে একটা শীর্ণকায়া নদী বয়ে গেছে। নদীটার ওপারে একটা মন্দির। মন্দিরটা পেরিয়েই ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকটা মড়া পড়ানোর শেষ চিহ্ন। তনু অনুপকে জিজ্ঞেস করে,- ‘ওটা কি মন্দির গো ?’
অনুপ তনুর বাঁ হাতটা ধরে চলতে চলতে উত্তর দেয়,- ‘ওটা শ্মশান কালীর মন্দির। কালী পূজার রাতে এখানে খুব ভিড় হয়। এই খোলা মাঠটায় মেলা বসে।’ 
অনুপের কথার উপর ভরকরেই তনু দেখতে পায় কত লোক মেলায় গিজ-গিজ করছে। কত চড়ক বসেছে। কত রকমের দোকান। কত রকমের খাবার। শুনতে পায়,- দাদা এদিকে আসুন, এদিকে, হরেক মাল দশ টাকা, দশ টাকা, দশ টাকা। এক অজানা অদেখা খুশির আনন্দে তনুর চোখদুটো ঝিকমিক করে উঠে। 
-‘এই অনুপদা, তোরা তো এবার হেঁটেই ফিরবি ? আমার খুব ঘুম পেয়েছে। আমি চললাম। বিকেলে আবার দেখা হবে।’ কথাটা বলেই ড্রাইভার গাড়িতে উঠে বসে। অনুপ সঙ্গে সঙ্গে তনুর হাত ছেড়ে এগিয়ে এসে বলে,-‘কাকিমাকে বলে আসিস আজ রাতে আমাদের বাড়িতেই খাবার খাবি।’ 
ড্রাইভার মুচকি হেসে বলে,- ‘বৌদির হাতের রান্না বলে কথা, না খেলে চলে। খেয়ে যাব। অবশ্যই খেয়ে যাব। তবে আজ নয়, অন্যদিন। আজকে সন্ধ্যায় আসব কিন্তু খাওয়া হবে নারে। একটা ভাড়া ধরা আছে।’ কথাটা বলেই ড্রাইভার মারুতি নিয়ে বেরিয়ে যায় লাল ধুলো উড়িয়ে। অনুপ আর তনু পায়ে পায়ে হাঁটতে থাকে আধমরা নদীটার উপর দিয়ে মন্দিটার দিকে।
-‘একটা কথা বলব ?’ চলতে চলতে কথাটা বলে তনু। 
-‘হুম,অবশ্যই।’ 
তনু আলতো ভাবে অনুপের বাঁহাতে চাপ দিয়ে প্রশ্ন করে,- ‘আমরা কোনও ভুল করলাম না তো ? কেমন যেন একটা ভয় ভয় করছে আমার।’ 
পরিচিত হাসি হেসে অনুপ বলে,- ‘ধুর পাগলি ভয় কিসের ? আমি তো আছি।’ 
তনু অনুপের হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলে,- ‘সে তো জানি। বাবা কিন্তু চুপ হয়ে বসে থাকবেন না। তুমি জান না বাবা ঠিক সুশান্ত কাকুকে সব বলে আমাকে তুলে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবে।’ 
-‘ওটা শুধু তোমার বাবা বলেই নয় সব বাবা-মায়েই তাই করত।’
-‘তাই তো ভয় পাচ্ছি, যদি ধরা পড়ে যাই । যদি তোমার কোনও ক্ষতি হয়ে যায়।’ একটা দুশ্চিন্তার বক্র রেখা ফুটে ওঠে তনুর কপালে। 
-‘তুমি মিছি মিছি ভয় পাচ্ছ তনু। আমাদের কোনও ক্ষতি হবে না। তাছাড়া জীবনের সব পথগুলোই তো সরল রেখার মতো নয়। জীবনে চলার পথে বাঁক আসবেই। ওই বাঁক আসার মুহূর্তটুকু তুমি শক্ত করে আমার হাত ধরে থেকো তাহলেই জীবনের সব পথ হাসি মুখে পেরিয়ে যেতে পারব আমি।’
-‘সত্যি বলছ ?’ কাঁপা কাঁপা চোখে তনু তাকিয়ে দেখে অনুপকে। 
-‘সত্যি সত্যি সত্যি তিন সত্যি।’ 
দূরের পলাশ বনের দিকে তাকিয়ে তনু বলতে থাকে, -‘মাঝে মাঝে মা-বাবার কথা ভাবলে খুব কষ্ট হয়। আমাকে আর অনুকে কত যত্ন করে মানুষ করলেন আর আজ আমরা যদি ওদেরকে একলা ফেলে নিজের নিজের জীবনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে থাকে তনু,- ‘ওদের হাতে জল তুলে দেওয়া তো দূরের কথা ওদের চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ারও কেউ থাকবে না। সত্যি করে বলো তো আমি কি স্বার্থপর নই ?’
কী উত্তর দেবে ঠিক খুঁজে পায় না অনুপ। তনু আরও উদাসীন ভাবে বলতে থাকে,- ‘জানি, আমি ওদের সাথে স্বার্থপরের মতোই আচরণ করলাম। কী বা করতাম! জীবন তো একটাই। তাই নিজের মতো করে বাঁচতে বড় লোভ হয়। না হয় একটা জীবন বাঁচার লোভে একটু স্বার্থপরই হলাম।’
না, আর কথা বলতে পারেনি তনু। অনুপের বুকে মাথা রেখে কান্নায় বোবা হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ ওরা দুজনে কালী মন্দিরে বসে দূরের পলাশ জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে পাতা ঝরা বসন্তের রূপ দেখছিল। পলাশ গাছগুলো যেন নীল আকাশে মুঠো মুঠো লাল মাখিয়ে দিচ্ছে। দূরের কোনও এক গাছের ডাল থেকে ছুটে আসছে কোকিলের কু-হু কু-হু সুর। মন্দির থেকে নেমে এসে এবার ওরা নদীর পাতলা জলে পা ডুবিয়ে বসে। 
পায়ে করে জল নাড়তে নাড়তে অনুপ তনুকে জিজ্ঞেস করে,- ‘তনু, তোমার খিদে পায়নি ? সেই তো কালকে রাতে এক টুকরো কেক আর দুটো বিস্কুট খেয়েছ।’ 
তনু মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়,- ‘না’ তার খিদে পায়নি। তারপর অনুপের বাঁ হাতটা কোলের উপর নিয়ে বলে,- ‘আমার কোনও ব্যাবহারে যদি কোনওদিন আঘাত পাও আমাকে গোপন কোরো না। রাগ অভিমান যখন যা হবে সব খুলে বলবে। এই পৃথিবীতে তুমি ছাড়া আমার আর কেউই রইল না।’ চোখ দুটো জলে ভরে আসে অনুপের। অকারণেই আজ তার মায়ের ঝাপসা ছবিটা মনে পড়ে যায়। 
-‘তুমি কাঁদছ অনুপ ? আচ্ছা পাগল ছেলে। আমি এমন কী বললাম শুনি যে তোমার চোখে জল চলে এলো?’ 
-‘না না, তোমার কথার জন্য নয়। জানি না কেন হঠাৎ মায়ের কথা খুব মনে পড়ে গেল। যদি একবিন্দুও কোনওদিন সুযোগ পাই আমি তোমার মা-বাবাকে আমাদের জীবনে নিয়ে আসবই দেখো। নতুবা আমার জীবনের অভাব যে কোনওদিনও পূর্ণ হবে না।’ তনু অনুপের মাথাটা নিজের বুকে টেনে চুলগুলোতে আঙুল বোলাতে থাকে। 
-‘জান তনু এখানেই আমার মাকে পোড়ান হয়েছিল। মা চলে যাওয়ার কয়েক বছর পরেও আমি এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে এসে চোখের জল ফেলে গেছি কতবার। যেদিন আমার মাকে খুব মনে পড়ত সেদিন আমি এখানে চলে আসতাম। ঐ যে মন্দিরের পাশে একটা গাছের কাটা কাণ্ড দেখছ, ঐ গাছটারেই শুকনো ডাল কেটে মাকে পোড়ান হয়েছিল।’ আঙুল বাড়িয়ে গাছের কাটা কাণ্ডটা দেখায় অনুপ। তারপর আবার বলে,- ‘কয়েক বছর আগের একরাতে গাছের বাকি অংশটা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে। এই শ্মশানের দিকে দিনের বেলাতেই তেমন কেউ আসে না। তায় রাতে গাছচুরি হলে কে আর জানবে। জানি না কেন যে গাছটার জন্যও মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে। মাকে তেমন মনে না পড়লেও মা-এর চিতায় জল ঢালার মুহূর্তটা আমার এখনও পরিষ্কার মনে আছে।’ 
তনুর বুকে মাথা রেখেই কথা গুলো বলে যায় অনুপ। তনু দেখতে পায় অনুপের চোখ দুটো আবার লাল হয়ে এসেছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে। তনু আর কাঁদতে দেয় না অনুপকে। নিজের গোলাপি ঠোঁট দুটো দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে অনুপের চঞ্চল ঠোঁট দুটো। চার ঠোঁটের ভালোবাসার সেতু বন্ধনে দু’জনের ছোটছোট দুঃখের টুকরোগুলো এপার ওপার হতে থাকে সহজেই। 

।।তিন।।
বেলা বেড়ে যাচ্ছে দেখে দুজনে এবার উঠে দাঁড়ায়। তারপর আনমনে হাঁটতে থাকে পলাশ বনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা গ্রামটার দিকে। দু’জনের কেউই আর বিয়ের ব্যাপারে দেরি করতে চায় না। দু’এক দিনের ভেতরেই একটা ভাল দিন দেখে বিয়েটা সেরে ফেলতে চায় তনু। বলা যায় না কখন সুখের ঘরে শিকারি হায়নার মতো অসুখ নেমে আসে। কথায় আছে শুভ কাজে দেরি করতে নেই, যদিও দেরি করার আর আছেই বা কী ? পুরোহিত ডেকে একটা শুভদিনে বিয়েটা সেরে ফেলা। আর গ্রামের মানুষদের একটা ভোজ দেওয়া। তনু অনুপের হাতে হাত রেখে নতুন জীবনের দিকে চলতে থাকে একপা একপা করে। লাল রাস্তা জুড়ে ঝরে পড়ে আছে রক্তিম পলাশ ফুলগুলো। 
চারপাশটাকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে দেখতে তনু বলে, -‘সত্যি তোমাদের গ্রামটা সুন্দর অনুপ। তোমার মুখে যেমন শুনে ছিলাম তার চেয়েও অনেক গুন সুন্দর। তুমি ভাগ্যবান এমন গ্রামে তোমার জন্ম।’ 
–‘তোমার তাহলে ভাল লেগেছে। যাক বাবা এদিক দিয়ে তো নিশ্চিন্ত হওয়া গেল।’ হাসতে হাসতে কথাগুলো বলে অনুপ। 
-‘না ইয়ার্কি নয়, সত্যিই তোমাদের রাধামোহনপুর গ্রামটা চোখ জুড়ানো।’
ছেলে মেয়ে দুটোকে দেখে কে বলবে এরা সমাজের মুখে পাথর দিয়ে সংসার গড়তে চলেছে। সত্যি অদ্ভুত পৃথিবী, অদ্ভুত সব নিয়ম। এত প্রেম এত প্রাণ তবু স্বীকৃতির সার্টিফিকেট নেই সংসার জীবন সমুদ্রে। বসন্ত আছে। ফুল ফুটেছে। কোকিল ডাকছে। তবুও অনুপ আর তনুর জীবনে সমাজ পালানো বিমুখ বসন্ত। হতেও তো পারত একটা স্বাভাবিক বিয়ে ? কিন্তু হল কোথায়? যারা পালিয়ে গেল প্রতারকের তকমা এঁটে তারা না হয় পালাল। কিন্তু যারা পারল না বাবা মায়ের শুকনো মুখের লক্ষ্মণ গণ্ডি পার হতে ? তাদের কেউ গেল অনিচ্ছার ফুলশয্যায়। কেউ বা এক জীবন কাটাবে কোনওদিন ভোর না হওয়া অন্ধকার রাস্তায়।
-‘আচ্ছা অনুপ তালডাংরার মেস থেকে তোমার মোটর বাইকটা কীভাবে আনবে এতদূর ?’ 
-‘এতদূর কোথায়?’ 
-‘বাঃ দূর নয় ? পুরো এক রাত্রির রাস্তা !’  
-‘তুমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এসেছ। তাহলে আর জানবে কী ? কালকে গাড়ি খারাপ না হলে রাত্রি একটা নাগাদ বাড়ি পৌঁছে যেতাম। আরে পাগলি বিষ্ণুপুর পার হওয়ার পর আর তো আমরা জনবহুল রাস্তায় আসিনি। অনেক ঘুরে ঘুরে এলাম। তোমার বাবা তো একটি যান্ত্রিক দেবতা। কোথায় যমদূত দাঁড় করিয়ে রাখবে সেই ভয়েই তো প্রায় পঞ্চাশ কিমি ঘুরে এলাম। তাতে করে আবার সোনারপুরে পিছনের টায়ার লিক হল। সেখানে গেল ঘণ্টা খানেক। পল্লব গাড়িতেই টুকটাক সারানোর সব যন্ত্রপাতি রাখে তাই রক্ষা। নতুবা কালকে রাত সোনারপুরেই থাকতে হত।’ 
-‘ওই ছেলেটার নাম পল্লব ?’ 
-‘হুম, দুবারেও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে না পেরে বাপের শেষ সম্বল বাহন টিকে বহন করছে। ওর গাড়িটা রাস্তায় কম গ্যারেজেই থাকে বেশি। আমরা এক সাথেই পড়তাম।’ 
-‘ওর বাড়ি কি তোমাদের গ্রামেই?’ 
-‘না ও পাশের গ্রাম জয়নগরে থাকে। আলাপ করিয়ে দেব পরে।’ 
দু’পাশের আলু জমিগুলো পার হতে হতে গ্রামের একমাত্র পুকুরটার দিকে চলতে লাগল দুজনে। গ্রামের এক প্রান্তে অনুপের দোতালা বাড়িটা দেখা যাচ্ছে।
-‘কিরে ভাইপো ভালো আছিস ?’ দূরের একটা সরসে ক্ষেতে জল পাওয়াতে পাওয়াতে একজন মাঝ বয়সী লোক প্রশ্নটা ছুড়ল অনুপের দিকে। 
-‘হাঁ অরুণ কাকা ভালই আছি। তোমার ডান পা ঠিক হয়েছে ? বিকাশ কবে আসবে কলকাতা থেকে?’ লোকটি এক কোদাল মাটি নালা থেকে সরিয়ে উত্তর দেয়, -‘এই বয়সে আর বাতের ব্যথা কী কমেরে বাবা। বিকাশ মকর সংক্রান্তিতে এসেছিল তোর খোঁজও করছিল। এই তো আগের হপ্তা আসতে গেছে।’  
-‘আর গ্রামের বাকি সব খবর ভাল তো ?’ 
-‘ওই সব আছেরে বাপ। গেল মাসে নামো পাড়ার তারিণী খুড়ো হঠাৎ মরল।’ 
-‘সে কী! আগের বারে এসে ভালই তো দেখে গেলাম তারিণী দাদুকে।’ 
কাজ করতে করতেই লোকটি উত্তর দেয়, -‘মানুষের জীবনটা যে চলে যাচ্ছে ওটাই তো ঢের আশ্চর্য। কে যে কবে মরবে ভগবান জানেন। তা তোর সাথে মেয়েটি কে ? বন্ধু নাকি ?’ 
প্রশ্নটা যে আসবেই সেটা অনুপ তনু দুজনেই বুঝতে পারছিল। তবুও লজ্জায় তনুর গাল দুটোতে লাল রঙ খেলে যায়। অনুপ সামান্যতম ইতস্তত না করেই বলল, -‘হাঁ কাকা বন্ধু। সন্ধ্যায় একবার বাড়ির দিকে যদি পার তো ঘুরে যেও। কথা হবে। এখন চললাম। আসি।’ 
-‘আচ্ছা বাবা সময় পেলে অবশ্যি ঘুরে যাব আজ না হলেও অন্য আরেক দিন।’ 
গ্রামের পুকুরটা পেরোতে পেরোতে অনুপ তনুর দিকে তাকিয়ে বলে, -‘রাস্তায় বা বাড়িতে কেউ কোনও প্রশ্ন করলে চুপ থেকো যা উত্তর দেবার আমিই দেব।’ 
-‘আচ্ছা বাবা আমি না হয় বোবালক্ষ্মী হয়েই থাকব। যাকে যা বলবার তুমিই বলবে।’ কথাটা বলেই তনু হাসতে থাকে। 
-‘ওই হাসির কী হল এখানে?’  
-‘কিছুই না এমনি।’ আবার হাসতে থাকে তনু। তনুর হাসি মুখটার দিকে অনুপ হ্যাংলার মতো তাকিয়ে থাকে। 
-‘সত্যিই ভীষণ মিষ্টি তোমার হাসিটা। লোভ হচ্ছে আবার। তখন নদীর ধারে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। এখন কিন্তু চাইতে ইচ্ছে করছে তনু।’  
-‘চোপ। অসভ্য ছেলে কোথাকার।’ লজ্জায় রাঙিয়ে যায় তনু অনুপের কথা শুনে। দুজন দুজনকে ঠেলা ঠেলি করতে করতে চলতে থাকে রাঙা মাটির রাস্তা দিয়ে। 
।।চার।।



-‘ওকে জিজ্ঞেস করে কোনও লাভ হবে না বাবা। আমি ভাল মতোই জানি ওর দিদি মরুক বাঁচুক ও মুখ খুলবে না।’ বেশ রাগের সঙ্গেই বিক্রম বাবু কথাগুলো বললেন শ্বশুর মশাইকে। বেলা দশটা নাগাদ হাতিরামপুর থেকে বিক্রম বাবুর শ্বশুর মশাই এসেছেন। এসেই জেরা শুরু করেছিলেন অনুকে। কিন্তু কেউ এখনও ছেলের নামটা পর্যন্ত অনুর কাছ থেকে আদায় করতে পারেনি। দাদুভাই নাতনিকে স্কুটি কিনে দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও অনুর সেই প্রথম থেকেই এক উত্তর, -‘আমি দিদির ব্যাপারে কিছুই জানি না। আমি ফর্ম ভরছিলাম দোকানের ভেতরে, পরে বাইরে এসে দেখি দিদি নেই।’ 
সুশান্ত বাবুও নিজের মতো করে চেষ্টা করছেন কিন্তু তিনিও ছেলেটির ব্যপারে কিছুই জানতে পারেননি। এমনকি ছেলেটি কোথায় থাকত কী করত তাও না। এদিকে সুমিত্রা দেবীর শারীরিক অবস্থাও ভাল না। ছাদে বিক্রম বাবুর সাথে যখন গল্প করছিলেন তখনি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যান। হয়তো সারা রাত কিছুই খেতে পারেননি তাই শরীরটা বেশ দুর্বল ছিল। বিক্রম বাবু কী করবেন কিছুই বুঝতে পারছেন না। মেয়েটা যে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাবে সেটা তিনি কল্পনাও করেননি। 
-‘দ্যাখো বাবা বিক্রম, আমার মনে হয় তোমার পুলিশ বন্ধুটির মাধ্যমে তেমন কিচ্চু হবে না। তার চেয়ে বরং আমাদেরই একটু খোঁজ খবর নেওয়া দরকার। তনু মায়ের কোনও না কোনও বন্ধু-বান্ধব এই ব্যপারে ঠিক জানবে। তাই বাবা, সময় নষ্ট না করে একটু খোঁজ নিয়ে এলে ভাল হত না ? নতুবা সময় পেরিয়ে গেলে আর খোঁজ পেয়েও তেমন সুবিধা হবে না।’ তনুর বাড়ির দিক দিয়ে বিচার করলে হয়তো কথাটা বিক্রম বাবুর শ্বশুর মশাই মোটেই মন্দ বলেননি। কিন্তু সমস্যা হল গিয়ে, এদিকে বিক্রম বাবু চান না ঘটনাটা পাঁচ কানে ছড়িয়ে পড়ুক। আবার মেয়ের ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে ভাবলেই ওনার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সারা পশ্চিম বাংলা জুড়ে যা চলছে তাতে মায়ের গর্ভের ভেতর থেকে শুরু করে একলা রাস্তায় মেয়েরা কথাও নিরাপদ নয়। ছেলেটার উপর একটা তীব্র বিরক্তি ফুটে উঠল বিক্রম বাবুর চোখে মুখে।
আর দেরি না করে শ্বশুর মশায়কে সঙ্গে নিয়ে নিজেই বুলেরোটা ড্রাইভ করে বেরিয়ে পড়লেন খাতড়া কলেজের দিকে। খাতড়া কলেজে তনু দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। কলেজ গেটে নেমেই দুজনে সোজা গিয়ে ঢুকলেন প্রিন্সিপ্যালের চেম্বারে। উনাকে সব খুলে বললেন। প্রিন্সিপ্যাল স্যার দ্বিতীয় বর্ষ ইতিহাস বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী দেরকে ডেকে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন তনুশ্রী চৌধুরীর ব্যাপারে কেউ কিছু জানে কি না। কিন্তু আশ্চর্য, তনুশ্রীকে একটি ছেলের সাথে মোটর সাইকেল আসা যাওয়া করতে প্রায় সকলেই দেখেছে কিন্তু ছেলেটির নাম ঠিকানা কারুরেই জানা নেই। ছেলেটি নাকি এই এলাকার ছেলেও নয়। কলেজে থেকে এর বেশি তেমন কিছুই জানতে পারলেন না বিক্রম বাবু।
পাংশু মুখে বাড়ি ফিরে এসে স্ত্রী সুমিত্রার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বিক্রম বাবু যখন এক বর্ষা রাতের গল্প বলছিলেন তখন দর-দর করে দুচোখ বেয়ে ঝরছিল দীর্ঘ একুশ বছরের ইতিহাস, -‘জান সুমি তখন আমার যা রোজগার ছিল তাতে দুটো মেয়েকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখাটা সহজ কথা ছিল না। ওই তনুর জন্যই আমি সাইকেলে করে বস্তা বস্তা খড়িমাটি বেচতে গেছি কত সব নাম না জানা গ্রামে। বাবার দেওয়া হাত ঘড়ি, মায়ের এক জোড়া সোনার বালা, সব হাসি মুখে বিক্রি করেছিলাম । ওই তনুর ধোঁয়ায় অ্যালার্জি ছিল বলেই চিরদিনের জন্য বিড়ি সিগারেট ছেড়েই দিলাম।’ 
শুয়ে শুয়েই বিক্রম বাবুর ডান হাতটা ধরে সুমিত্রা দেবী বললেন, -‘তুমি এমন করে কাঁদলে আমি কেমন করে থাকি বল তো ? কেঁদো না, কেঁদো না। জানব আমি ওকে গর্ভে ধরিনি। আমাদের একটাই মেয়ে।’ 
–‘তুমি ভুল ভাবছ সুমি। তনু চলে গেছে বলে আমি কাঁদছি না। আমি কাঁদছি শুধু,- ওই পুচকে পুচকে দুটো হাত আমাকে কত সহজে একুশ বছর ধরে ঠকিয়ে গেল সেটা ভেবেই। আমাদের কোনও সন্তান নেই সুমি। আমাদের কোনও সন্তান নেই।’ কাঁদতে কাঁদতেই ঘরের বাইরে বেরিয়ে যান বিক্রম বাবু।

।।পাঁচ।।
অনুপের বাড়িটা তনুর বেশ ভালই লেগেছে। দো’তলা হলুদ রঙকরা বাড়ি। বড় লোহার গেট পেরিয়ে সরু মতো একটা রাস্তা ঢুকেছে বাড়ির দিকে। রাস্তাটার দুদিকে দেশি বিদেশি নানান ধরণের ফুলের গাছ লাগানো। কত রকমের ফুলের বাহার। ফুল গুলোর উপর বসন্ত বাহক ছোট-বড় মৌমাছি গুনগুন করছে। বাড়িতে ঢোকার পথে ডান দিকের বাগানটার একপাশে একটা পাট কুয়ো। কুয়োটার উপর একটা ছোট মাপের পাম্প বসান আছে। বাগানের বাহার দেখেই বোঝা যায় অনুপ বেশ শৌখিন ছেলে। ঘরে ঢোকার মুহূর্তেই একজন বয়স্ক ভদ্র মহিলা বেরিয়ে এলেন একটা থালায় ধান দূর্বা প্রদীপ সাজিয়ে নিয়ে। তনু অবাক ভাবে দেখছিল মহিলাটিকে। তনু এসবের কিছুই জানত না। অনুপ কিচ্ছুটি বলেনি। তবে তনুর চিনতে ভুল হয় না, মুক্তা মাসিকে । তনু অবাক হয়ে অনুপকে জিজ্ঞেস করল, -‘তুমি তো এসবের কিছুই বলনি। ইনিই মুক্তা মাসি তাই না ?’ অনুপ মুচকি হেসে তনুর কথায় ঘাড় নাড়ে শুধু। 
এই মুক্তা মসিই দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটির সাথে সাথে অনুপকেউ দেখে আসছেন। উনার যত্নেই ফুলের চারাগুলিও যে মাথা তুলেছে তা বুঝতে ভুল হয় না তনুর। নামের সাথে মাসি শব্দটার মতোই একটা মায়া এসে বসে গেছে চিরদিনের জন্য মুক্তা মাসির মুখে। অনুপ তখন সাত বছরের, যখন অনুপের মায়ের সাথে মুক্তা এই বাড়িতে আসে। অনুপের মা বাপের বাড়িতে গিয়েছিল অনুপকে নিয়ে শিবের গাজনে। সেই সময় মুক্তা একদিন এসেছিল অনুপের মায়ের সাথে গল্প করতে। ঐদিনেই তার বৈধব্য জীবনের কাহিনি শুনিয়ে ছিল মুক্তা অনুপের মাকে। অনুপের মা সেসব শুনেই বলে ছিলেন,- ‘আমার সাথে চল।’  না, বলেনি মুক্তা। সেই থেকে এখানেই আছে। অনুপের মা মারা যাবার পরে তিনি আর অনুপকে ফেলে যেতে পারেননি। এখন অনুপের বাবাও নেই। অনুপও থাকে না বললেই চলে। তাই বাড়ির পুরো দায় দায়িত্ব মুক্তার হাতেই। মুক্তা ধান দূর্বা আর একটা সোনার বালা দিয়ে আশীর্বাদ করে তনুকে। তারপর প্রদীপের আলোয় বরণ করে নেয় বাড়ির লক্ষ্মীকে। তনু মুক্তা মাসির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই তিনি তনুর কপালে চুম্বন করে বলেন, -‘দুজনে সুখে শান্তিতে থেকো মা।’ তারপর একটা সোনার বালা তনুর ডান হাতে পরিয়ে দিয়ে আবার বলেন, -‘এই সোনার বালাটা তোমার শাশুড়ি মায়ের। মারা যাবার আগে আমাকে দিয়ে বলেছিল, বৌমায়ের মুখ দেখে এটাই দিবি।’ অনুপও মাসিকে প্রণাম করে তনুর পিছু পিছু। 
‘ওটা তোমার শাশুড়ি মায়ের ছবি। উনাকে প্রণাম কর মা।’ দেওয়ালে ঝোলান অনুপের মায়ের ছবির দিকে আঙুল বাড়িয়ে কথাটা বলেন মুক্তা মাসি। তিনজনে ছবিটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখ দুটো জলে ভরে আসে অনুপের।

পল্লবের সাথে সন্ধ্যায় কোথায় বেরিয়েছে অনুপ। এদিকে মুক্তা মাসি হবু বৌমায়ের জন্য পায়েস বানাচ্ছেন রান্না ঘরে। তনু একা একাই এসে দাঁড়ায় খোলা মেলা ছাদে। আকাশে টিপ পরার মতো করে চাঁদ উঠেছে দূরের পলাশ জঙ্গলটার উপর। চাঁদের আলো পড়ে পুকুরের জলের যে অংশটা ঝিলমিল করছে সেদিকেই তাকিয়ে থাকে তনু। বাবা-মাকে এমন ভাবে কাঁদিয়ে আসার ইচ্ছে তারও কোনওদিনেই ছিল না। হয়তো কলেজ বন্ধ করে মোবাইলটা কাড়িয়ে নেওয়াতে তনু অনুপকে হারানোর একটু বেশিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। জ্যোৎস্না মোড়া পুকুরটার দিকে তাকিয়ে আজকে তনুর কত কথায় না মনে পড়ে যাচ্ছে। স্কুল থেকে ফিরতে দেরি হওয়ায় মায়ের না খেয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা। শরীর খারাপের সময় মা বাবার রাত জেগে বসে থাকা। বিশেষ করে মনে পড়ছে সেই সন্ধ্যাটার কথা, তখন তনুর বয়স ১১-১২ বছর হবে হয়তো। তনু বাড়িতে না বলেই গিয়েছিল পাশের পাড়ার বান্ধবী নমিতাদের বাড়ি। সেদিন নমিতার জন্মদিন ছিল। বিকেল হতে না হতেই শুরু হল ঝম ঝম করে ঝড় বৃষ্টি। বাড়িতে খবর দেবার কোনও উপায় ছিল না। সেদিন বিক্রম বাবু সবার বাড়ি গিয়ে গিয়ে রাত্রি ন’টা নাগাদ নমিতাদের বাড়ি এসে তনুকে খুঁজে পেয়েছিলেন। সেদিন তিনি তনুকে একটুও বকাবকি করেননি। কোলে নিয়ে শুধু বলেছিলেন, -‘একবার বলে আসতে পারতে মা। আমাদের কত চিন্তা হচ্ছিল ভাবো।’ সেদিন তনু প্রথম দেখেছিল বাবার ভিজে যাওয়া চোখ দুটোকে।
তনুর ভাবানার ভেলাটা ছিন্নভিন্ন হয়ে এলোমেলো ভাসতে থাকে। একটা অপঠিত দুশ্চিন্তায় ওর বুক দুটো কেঁপে চলে অবিরাম। চাঁদটা তখন পলাশ বাগানের উপর থেকে সরে গিয়ে পুকুর পাড়ের কাছা কাছি এসে দাঁড়িয়েছে। চারিদিকে পড়ে আছে থোকা থোকা জ্যোৎস্না। একটু পাশ ফিরে তাকাতেই তনুর চোখে পড়ে একটা সবুজ পাহাড়। এক মুঠো জঙ্গল পেরিয়েই পাহাড়টা। খুব বেশি হলে মাইল চারেক হবে হয়তো। পাহাড়টার দিকে তাকিয়ে চঞ্চল মনটায় কোথাও যেন একটা শান্তি পায় তনু। যেন ছোটবেলা থেকেই এই পাহাড়টা ওর চেনা। আসলে কিশোরীবেলা থেকেই বন-পাহাড়-নদী, তুষার ঢাকা পর্বত-নীল সমুদ্র তনুকে টেনে নিয়ে যেত বিভূতি ভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’-এ। সে যেন দেখতে পেত সেই আগ্নেয় পর্বতটাকে পিছনে ফেলে শঙ্কর-আলভারেজ ছুটছে পশ্চিমের পাহাড়টার দিকে। 
-‘তনু, এই তনু। তুমি এখানে একলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কি করছ ? ওদিকে আমি সারা বাড়ি তোমাকে খুঁজে ফিরছি। ঠিক জানতাম বাড়িতে মন বসবে না তোমার ?’ দুহাতে করে তনুর গালদুটোকে তালু বন্দি করে অনুপ। 
হঠাৎ অনুপ এসে পড়ায় একটু ঘাবড়েই গিয়েছিল তনু। ভাবখানা এমন যেন ভাবনার ভেতরে ডুবে ডুবে কিছু চুরি করছিল। কয়েক সেকেন্ডে নিজেকে সামলে নিয়ে তনু বলে,-‘না রে বাবা। জ্যোৎস্নার আলোটা খুব সুন্দর লাগছিল তাই ছাদে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’ 
-‘মা বাবা বোনের জন্য মন খারাপ করছে তাই না ?’ তনুর মাথাটা বুকে নিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করে অনুপ। -‘বেশি না, একটু একটু করছে।’ 
-‘দাঁড়াও অনুকে একটা ফোন করি।’ 
ভয় পেয়ে যায় তনু, -‘না না, একদম না। ওদিকে কি চলছে ভগবান জানেন। আগে ভালই ভালই বিয়েটা চুকুক।’ অনুপের বুকের থেকে নিজেকে আলতো ভাবে মুক্ত করে কথাগুলো বলে তনু। তারপর ছাদের এক কোনায় গিয়ে দাঁড়ায়। 
-‘আচ্ছা তনু সত্যি বলবে, তোমার কেন আমাকে ভালো লেগেছিল ? যতবার জিজ্ঞেস করেছি তুমি বলেছ ভালবাসার কোনও কারণ থাকে না। মানলাম তেমন কারন হয়তো থাকে না। তবুও কিছু একটা ভাললাগার থেকেই তো ভালবাসাটা জন্মায় বলো ?’
-‘আগে তুমি বলো তোমার কেন ভাল লাগল আমাকে ? আমি তো তেমন আহামরি কিছু দেখতেও না। সেই তুলনায় তুমি আমার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। তোমার সুন্দরি মেয়ের অভাব হত না।’ অনুপের দিকে পিছন ফিরেই প্রশ্নটা করে তনু। 
এই সব জটিল প্রেমতাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা মোটেই সহজ কথা নয়। উত্তর তৈরি হবার আগেই প্রশ্ন তার রঙ বদলে নেয়। আবার আজকের দেওয়া উত্তরে কাল মন ভরে না। কত ছোট ব্যাপার মনে ধরে যায় আবার কত বড় ব্যাপার চোখেই পড়ে না। কত ছোটো জিনিসেই ভাললাগার হাত ধরে সম্পর্ককে টেনে নিয়ে যায় ভালবাসার সাগরে। আবার কত বড় জিনিস মনের আঙিনায় ভাললাগাও তৈরি করতে পারে না।
-‘সত্যি বলতে আমি নিজেও জানি না কেন তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রথম বারেই আমার মনে হয়েছিল ওই দুচোখে আমার জন্য ভালবাসার ভাঁড়ার সাজান আছে। আর একটা গোপন কথা বলব যদি না কিছু মনে কর ?’  
-‘মনে করব আবার কেন। বল না কি বলবে ?’ তনুর দু’চোখে প্রশ্ন চিহ্ন ফুটে ওঠে।  
-‘প্রথম যেদিন তুমি আমার মোটর সাইকেলে চেপেছিলে জানি না কেন আমার সারা শরীর জুড়ে কেমন একটা হচ্ছিল। ঠিক বোঝাতে পারব না কিন্তু অমন অদ্ভুত অনুভূতি আগে কখনোই হয়নি।’ 
-‘তুমি না একটা ছাগল।’ তনুর গালদুটো লজ্জায় রাঙিয়ে যায়। চাঁদের আলোতেও সেটা অনুপের দৃষ্টি এড়ায় না। 
-‘জানতো তনু ওই নদীর জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকার সময় যখন তুমি আমার ঠোঁটে…’ 
-‘অনুপ ভাল হবে না বলছি। এবার কিন্তু সত্যি সত্যিই রেগে যাব।’ 
-‘আজকে রাতে স্বপ্নে আমার ঠিক ওই রোগটা আবার…’ 
-‘তুমি এত অসভ্য জানলে আমি কোনওদিনেই তোমার সাথে অন্তত বাড়ি ছাড়তাম না।’ লজ্জায় তনু ছাদের আরেকটা কোনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনুপের কথাগুলো তনুর সারা শরীর জুড়ে একটা অচেনা শিহরণ জাগিয়ে দিয়েছে।
‘বাড়ি ছাড়তাম না’ কথাটা তনু লজ্জা পেয়ে হেঁয়ালি করেই বলেছে। তবুও ওই ছোট্ট কথার একটা টুকরো অনুপ কে আঘাত করে মন খারাপের রাজ্যে ছুড়ে ফেলে দেয়। দুজনেই বেশ কয়েক মিনিট চুপ করে থাকার পর তনুই এগিয়ে আসে অনুপের দিকে। বুঝতে পারে অনুপের কোথাও একটা খারাপ লেগেছে তাই ও চুপ করে গেছে। নতুবা অনুপ চুপ করে থাকার ছেলেই নয়। অন্তত এমন মুহূর্তে, প্রেম যখন শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে। তনু আগেও দেখেছে অনুপের কোনও কারণে মন খারাপ হলে সে চুপচাপ দূরের দিকে তাকিয়ে মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করে। ইকোপার্কে বসেও মাঝে মাঝে অনুপ এমনটাই করত। কাছে এসেই তনু দেখে, অনুপ দূরের আলোআঁধারি বাড়ি গুলোর দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। আর ওর দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে অভিমানী জলের ধারা। দু’তিন পা ছুটে এসে তনু অনুপকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। এভাবে চুপচাপ আরও কয়েক মিনিট পেরিয়ে যায়। 
-‘এই ছাগল তুমি রাগ করেছ ?’ তনুই রাত্রির নীরবতা ভেঙে প্রশ্নটা করে। অনুপ উত্তর দেয় না দেখে তনু আবার বলে, -‘তুমি যদি কাঁদতেই থাক তাহলে আমিও কিন্তু কেঁদে ফেলব বলছি। আমি এমন কি বললাম যে তুমি এতটা কষ্ট পেলে। বিশ্বাস কর আমি তোমাকে কষ্ট দেবার জন্য একটা কথাও বলিনি।’ তনুর চোখ-দুটোও এবার সজল হয়ে ওঠে।
-‘তনু সত্যিই কি আমি এতটাই খারাপ যে কেউই ভরসা করতে পারে না আমাকে।’ 
-‘তুমি এমন করে বলছ কেন অনুপ ? আমি তো তেমন কিছুই বলিনি। কে তোমাকে ভরসা করতে পারে না ? আমি তো তোমার ভরসাতেই বাড়ি পর্যন্ত ছেড়ে দিলাম।’ 
-‘না না তুমি কেন হবে। আমি সংগঠনের কথা…’ 
-‘কোন সংগঠন ?’ অনুপকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই প্রশ্নটা করে তনু। 
অনুপ কথাটা পাল্টে তনুর চোখে চুমু খেয়ে বলে, ‘ওসব কথা পরে হবে। চল খাবার নিয়ে মাসি অপেক্ষা করে বসে থাকবে হয়তো।’ কথাটা বলেই এক রকম ভাবে ছুটেই নীচে চলে যায় অনুপ। কোন সংগঠনের কথা বলতে গিয়েও চেপে গেল অনুপ সেটা বুঝতে পারে না তনু।
আগেও অনুপ একবার কোন দলের কথা বলতে চেয়েছিল তনুকে কিন্তু সেদিনও কিছুই বলেনি, ‘থাক, পরে বলব’ বলেই চুপ করে গিয়েছিল সেদিনও। সেদিন তনু কথাটা তেমন আমল দেয়নি। আজকে অনুপের আচরণটা একটু অন্য রকম লাগে তনুর চোখে। অনুপের মন খারাপ হলে সে উদাস হয়ে পড়ে ঠিক কথাই। আবার তনু যখন আদর করে তখন সব উদাসী হাওয়া কেটে আলোর রেখা বেরিয়ে আসে অনুপের ঠোঁট বেয়ে। আজকে তনু লক্ষ্য করেছে শেষ দিকের কথাগুলো বলবার সময় কেমন যেন কাঁপছিল অনুপ। অনুপের দুটো চোখেই একটা ক্রুদ্ধ রেখা পরিষ্কার দেখেছে তনু। আজকে অনুপের ঠোঁটেও না ছিল কোনও হাসির রেখা না ছিল কোনও আলোর ঠিকানা। হঠাৎ একটা রহস্য মাখানো গন্ধ এসে যেন তনুর নাকে মুখে ঝাপটা মেরে যায়।
।।ছয়।।
মুক্তা মাসি আজকে অনেক কিছুই রান্না করেছেন। উনি চান না অনুপ বা তনু কেউ আজকের দিনে মা এর অভাব অনুভব করুক। যদিও তনু রাত্রিতে তেমন কিছুই খায় না, তবু আজকে থালা পরিস্কার করেই সব খেয়েছে। হয়তো একটু জোর করে। পাছে না খেলে মাসি খারাপ কিছু ভেবে বসেন। অনুপ খেতে বসে চুপচাপ খেয়ে গেল, মুখে একটি কথাও বলল না। হাত ধুয়ে উপরের ঘরে যাবার সময় শুধু বলে গেল,-‘মাসি, তনুর শোবার ব্যবস্থা দক্ষিণের ঘরটাতে করে দিও। আমার আজকে অনেক কাজ আছে। কাজগুলো সেরে আমি পড়ার ঘরেই শুয়ে পড়ব। তনু আজকে তুমিও ক্লান্ত তাই বেশি রাত জাগতে হবে না। আজকে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়বে। শুভরাত্রি।’ কথাগুলো বলেই সিঁড়িতে চপ্পলের শব্দ তুলে উপরে চলে যায় অনুপ।
অনুপের এমন অদ্ভুত আচরণে মনে মনে তনু যথেষ্ট বিরক্ত হয়। অনুপের বাড়িতে প্রথম রাত কাটানোর স্বপ্ন তনু অনেকবার দেখেছে। সেই স্বপ্নগুলোর সাথে আজকের রাতটার তেমন মিল খুঁজেই পেল না তনু। তনু ভেবেছিল আজকের রাতটা অনুপের মাথাতে হাত বোলাতে বোলাতে গল্প করেই কাটিয়ে দেবে। না বলা সব গল্পগুলো আজকেই বলবে অনুপকে। কিন্তু তা আর হবে না। 
-‘কী এত ভাবছ মা, বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে ?’ তনুর থালাতে আরও অল্প পায়েস দিতে দিতে প্রশ্নটা করেন মুক্তা মাসি। চমক ভাঙতেই তৎক্ষণাৎ তনু উত্তর দেয়, ‘কোনওদিন মা-বাবাকে ছেড়ে থাকিনি তো তাই আজকে একটু…’ 
-‘মন খারাপ হওয়াটা তো অনুচিত নয় মা।’  
-‘আচ্ছা মাসিমা অনুপ আপনাকে কখন জানাল আমরা আসছি বলে ?’ 
-‘আমাকে তো কালকে বিকেলেই ফোন করে সব বলেছিল।’ 
-‘আপনিই তো অনুপকে মানুষ করেছেন কোলে পিঠে। অনুপ যখনি বাড়ির কথা বলত তখনি মা আর মুক্তা মাসিরেই গল্প শুনতাম শুধু। আচ্ছা মাসিমা একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?’ 
-‘কথা পরেও তো হবে মা আগে ভালো করে খেয়ে নাও এখন।’ 
তনু আর কথা না বাড়িয়ে অবশিষ্ট পায়েসটুকু খেতে খেতে অনুপের হঠাৎ পরিবর্তনের কারণটা খুঁজতে থাকে। আজকে অনুপের বাড়িতে প্রথম রাত তনুর অথচ তনুর খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অনুপ অপেক্ষাও করল না! এটাও তনুর কাছে কম অভিমানের নয়।
খাওয়া সেরে তনু বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। তাকিয়ে দেখতে থাকে ফুল গাছ গুলোকে। চাঁদের আলোতে রঙবাহারি ফুলগুলোকে দারুণ দেখতে লাগছে। কয়েকটুকরো মেঘকে চাঁদের পাশ দিয়ে পায়ে পায়ে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে একটা ঠাণ্ডা বাতাস। তনুর মনে হল মেঘগুলো যেন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ছিল, আর বাতাস ওদের চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাড়ির পথে। পাশের রান্না ঘরের বেসিন থেকে তখনো ভেসে আসছে মুক্তা মাসির বাসন ধোয়ার টুং-টাং শব্দ। বাইরের জ্যোৎস্না জোয়ারে গা-ডুবিয়ে মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে ডাহুক-পিউকাঁহা পাখি। কত রাত তনু এই সব পাখিদের মন কাঁদানো ডাকে হারিয়ে গেছে কল্পনায় দেখা একটা নদী আর ঝাঁও গাছের জঙ্গলে। মাধ্যমিক –উচ্চমাধ্যমিক বয়সে ইতিহাস বই পড়তে পড়তে তনু অনেক রাত অবধি শুনত নানান পাখির কাকলি। সেই রাতগুলোই যেন ফিরে এসেছে অনুপের বাড়ির আঙিনায়। 
-‘মা, অনেক রাত হয়ে গেছে। আজকে অন্তত শুয়ে পড়বে যাও। কাল থেকে তোমাদের শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল পেরিয়েছে। রাত জাগলে শরীর খারাপ হয়ে পড়তে পারে।’ 
তনু খেয়ালেই করেনি কখন মুক্তা মাসি পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে, -‘আমার এত তাড়াতাড়ি ঘুম আসতে চায় না মাসিমা। সেই বিছানায় শুধু শুয়ে-শুয়ে এপাশ ওপাশ করা। তার চেয়ে কি সুন্দর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখছি।’   
এক চিলতে হেসে মুক্তা মাসি বলেন,-‘এক্কেবারে পাগলি মেয়ে। জান তো মা আমারও একটা মেয়ে ছিল। ওই অনুপের সম বয়সি। তালের পিঠে খাবার খুব সখ ছিল মেয়েটার। ওই লোভেই একদিন খুব ভোর ভোর উঠে ছুটেছিল তাল কুড়োতে। সেই যে গেল...’ কথাগুলো জিবে জড়িয়ে যায় মুক্তা মাসির। শাড়ির খুটে করে চোখের জল মোছেন । 
-‘তারপর কী হয়েছিল মাসিমা ?’ ইতস্তত করেই প্রশ্নটা করে তনু। 
-‘সেদিন ভোরেই সাপকাটি হয়ে মেয়টা মারা যায়। শেষ দেখারও সুযোগ দেয়নি ভগবান। এক মুখ ফ্যান নিয়ে প্রতিমা আমার তাল গাছের নীচেই মরে পড়েছিল। শেষ রাতে পড়া বলতে না পারার জন্য আমি ওকে মেরেও ছিলাম। মেয়েটা মায়ের উপর রাগ করে চলেই গেল। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ক্যান্সার রোগ এসে সিঁদুরটাও দিল মুছে।’ কথাগুলো বলতে বলতেই নিজের ডান হাতটা বারবার দেখছিলেন মুক্তা মাসি। হয়তো নিজের ভাগ্যরেখাটাকে খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। মাসিমার মুখের দিকে তাকিয়ে তনু একটা কথাও বলতে পারে না। ঠাই দাঁড়িয়ে থাকে পাথরের মূর্তির মতো। 
-‘যাও মা শুয়ে পড়বে যাও ভালই রাত হল।’ আবছা আলোতেও তনু দেখতে পায় মাসির চোখ বেয়ে জলের রেখা গড়িয়ে নামছে। একদিনের যৎসামান্য আলাপে দুই নারী দুই নারী বুকের কত গভীরে চলে এসেছে নিজেরাও তার পরিমান জানে না।
অনেক চেষ্টার পরেও ঘুম আসছিল না তাই জানালা দিয়ে দূরের বাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল তনু। আজকে শুধু ছোটবেলার স্মৃতিগুলোই দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে নামছে। শুয়ে শুয়ে বাবার মুখটা খুব মনে পড়তে লাগল তনুর। এমন সময় দূরের পুকুর পাড়ের ওপার থেকে এক দল শেয়াল ডেকে ওঠে হুক্কা হুয়া করে। 
শুয়ে-শুয়ে নড়বড় করতে করতেই কখন যে তনুর তন্দ্রা চলে এসেছিল নিজেই বুঝতে পারেনি। হঠাৎ নীচের বারান্দায় কাদের কথা বলার আওয়াজ শুনেই হয়তো ঘুমটা ভেঙে গেল। ভয়ে ভয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিল তনু। তেমন পরিষ্কার ভাবে না হলেও দেখল চারজন লোক দাঁড়িয়ে গল্প করছে। ভয় পেয়ে যায় তনু। চোর নয় তো ? 
অনুপকে পাশের ঘরে গিয়ে ঘুম থেকে তুলবে কি না এটাই ভাবছিল তনু। ঠিক এমন সময় শুনতে পেল অনুপের গলার আওয়াজ। হাঁ নিচ থেকেই ভেসে এলো আওয়াজটা। তনু কান খাড়া রেখে নীচের থেকে ভেসে আসা হালকা শব্দগুলোকে কানে ধরার চেষ্টা করল। 
-‘এই সপ্তাহে করতে হবে।’ আর ‘আমি ছেড়ে দেব ভাবছি।’ কথা দুটো ছাড়া আর তেমন কিছুই শুনতে পেল না তনু, অনেক চেষ্টা করেও না।
কাদের সাথে অনুপ এত রাতে কথা বলছিল ? কি করতে হবে এই সপ্তাহে ? কে কী ছেড়ে দেবে কিছুই মাথা মুণ্ডু খুঁজে পেল না তনু। কেমন যেন একটা অচেনা ভয় বুকে জাঁকিয়ে বসে গেল তনুর। অনেক চেষ্টা করেও যখন ঘুম এলো না তখন আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে চন্দনের ঘরে উঁকি মেরে দেখল তনু। ঘরের লাইটটা জ্বলছে। আর ঘরের মেঝেতে মাথায় হাত রেখে চুপ চাপ বসে আছে অনুপ। গোটা মুখ জুড়ে একটা দুশ্চিন্তার প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে। একবার ভাবল কী হয়েছে অনুপকে জিজ্ঞেস করবে। পরে আবার ভাবল না থাক, দুটো দিন আগে দেখি কী ব্যাপার তেমন সন্দেহ জনক কিছু দেখলে জিজ্ঞেস করা যাবে। আবার পা টিপে টিপে তনু নিজের ঘরে ফিরে আসে।
পরদিন সকালে যখন তনুর ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির কাঁটা ন’টার ঘর ছুঁই-ছুঁই করছে। ফুলের বাগানে বেশ কিছু পাখি ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে উড়ছে এদিক সেদিক। বিছানা থেকে উঠে বসল তনু। ভাল করে ঘুম না হওয়ার ক্লান্তি এখনও চোখে মুখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। বিছানাটা গুছিয়ে রেখে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল তনু। দুহাত দিয়ে চুলগুলোকে একটু ঠিক ঠাক করতে যাবে এমন সময় পিছন থেকে ভেসে এলো পরিচিত কণ্ঠ, -‘সুপ্রভাত। কালকে ঘুম কেমন হয়েছে তোমার ?’ পিছন ফিরে তনু দেখল, একটা সাদা পাঞ্জাবির উপর মেরুন রঙের হাফ শুয়েটার চাপিয়ে পাজামার রশিটা বাঁধতে বাঁধতে দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে অনুপ। 
-‘সুপ্রভাত। ভালই ঘুমিয়েছি। ঘুম ধরতে একটু রাত হয়েছিল এই যা। কিন্তু তুমি এত সকালেই স্নান করলে যে ? কোথাও যাবে নাকি ?’ চুলটা বাঁধতে বাঁধতে জিজ্ঞেস করল তনু।
-‘না এখন কোথাও যাব না। পরে একবার বেরোব।’ 
সকালে অনুপের চোখে-মুখে গত কালকে রাতের কোনও ছাপেই খুঁজে পেল না তনু। বরং বেশ খুশি গড়িয়ে পড়ছে অনুপের চোখ মুখ বেয়ে। কোথাও কোনও ভয়ের প্রতিবিম্ব নেই। নেই কোথাও সামান্যতম অন্ধকার। 
-‘কী দেখছ তনু অমন করে আমার মুখে ?’ কয়েক পা এগিয়ে এসে প্রশ্নটা করল অনুপ। 
-‘না, তেমন কিছুই না। দেখছিলাম পাঞ্জাবিতে তোমাকে বেশ মানিয়েছে।’ 
-‘যাও ফ্রেস হয়ে নেবে। মাসি জল গরম করেই রেখেছে স্নানটাও সেরে ফেলতে পার।’ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল তনু কিন্তু অনুপ কথাটা বলেই বাইরে বেরিয়ে গেল।
সকালের আলোয় চারদিকটা ভরে গেছে কানায় কানায়। জানালা পথে তনু দেখতে পেল পুকুরের পাশ দিয়ে এক সব্জি ওয়ালা পেরিয়ে যাচ্ছে। সাইকেলে ঝুলছে সব্জির ব্যাগগুলো। পিছনের ক্যারিয়ারেও ঝুড়ি ভরতি সব্জি। তনুর চোখে ভেসে উঠল অনেক দিন আগের একটা ডোরাকাটা ছবি। যখন তনুর বাবা সাইকেলে করে খড়িমাটি নিয়ে যেত দূর গ্রামের দিকে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তনুর দু’চোখ ঝাপসা হয়ে ভাসতে লাগল ফেলে আসা স্মৃতির ভেলায়। 
আজকে সন্ধ্যার সময় তনু অনুপের পড়ার ঘরের বিছানায় বসেই হীরেন চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাতের রজনীগন্ধা’ উপন্যাসটায় চোখ বোলাচ্ছিল। অনুপ পাশেই একটা চেয়ারে বসে টেবিলে রাখা কম্পিউটারে গুগল ম্যাপ স্যাটেলাইট ভিউ খুলে মনোযোগের সঙ্গে দেখছিল কোনও একটা গ্রামের ছবি। ঠিক তখনি অনুপের মোবাইলটা বেজে ওঠল। নাম্বারটা দেখেই মোবাইলটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায় অনুপ। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে চুপটি করে চেয়ারে বসে পড়ে। তনু লক্ষ্য করে আবার অনুপের চোখে মুখে একটা অস্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু ঠিক কালকে রাতের মতো নয়। আজকে যেন অনুপের চোখে ভয়ের কণা মাত্র নেই। হিংস দেবতার মতো চোখ দুটো যেন কম্পিউটার টাকে গিলে ফেলবে। নাক দিয়ে বেশ জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়তে থাকে অনুপের। ভয়ে বিস্ময়ে তনুর বুকের ভেতরটা এক মুহূর্তে হিম হয়ে যায়। অনুপের এমন ছবি তনু কখনও দেখা তো দূরের কথা হয়তো কল্পনাতেও ভাবতে পারত না। চেয়ার থেকে উঠে এসে অনুপ তনুর পাশেই বিছানার উপর ধপাস করে বসে পড়ে। তারপর তনুর কাঁধ দুটোকে ঝাঁকিয়ে বলে, -‘তনু আমরা কি সত্যি স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক ?’ 
এমন প্রশ্নের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না তনু, তাই ঘাবড়ে গিয়ে বলে,- ‘মানে ?’ 
অনুপ আবার চতুর্গুণ উত্তেজনার সাথে বলে, -‘তুমি কি স্বাধীন ভারতের স্বাধীন নাগরিক তনু ?’ 
তনু কিছুই বলতে পারে না। ভয়ে তখন তার ভেতরটা পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে। তনুর কাঁধ ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় আনুপ। জানালার বাইরে চোখ রেখে বলতে থাকে, -‘সাদা চামড়ার চাবুকে মারলেও ব্যথা লাগে কালো চামড়ার হলেও লাগে। ঘরের লোক মারুক আর পরের লোক মারুক ব্যথা লাগেই। যে শেয়াল গুলো ১৫-ই আগস্ট ২৬-শে জানুয়ারি পতাকা উত্তোলন করল তারাও স্বাধীন। যে বাচ্চাগুলো ওই শেয়ালের ফেলে যাওয়া খাবারের টুকরো কুকুরের সাথে ভাগ করে খেল তারাও স্বাধীন।’ কিছুক্ষণ উদাসীন ভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে থেকে আবার আপন মনেই একটা কবিতা আওড়ে চলে অনুপ,-
‘হে আমার স্বাধীন দেশের পর্ণগ্রাফিতে ভেসে যাওয়া 
পরাধীন ভারতবাসী, তোমরাই ধর্ষণ করে 
দাঁড়িয়ে যাও রাস্তায় দলে দলে মোমবাতি মিছিলে
কোনওদিন কি ভেবেছিলে ? তোমার শিশ্নের চাবুকে পুড়ে
যে মেয়েটি পড়েছিল ফুটপাতে। সেও ১৫-ই আগস্ট মানিয়েছিল
গেরুয়া সাদা সবুজ পতাকা ২৬-শে জানুয়ারি, তোমারই সাথে।’
কবিতাটা বলতে বলতে অনুপের চোখ দিয়ে জল পড়তে থাকে। তনু বুঝতে পারে অনুপের কিছু একটা হয়েছে। কিন্তু সেটা ঠিক কী তা বুঝতে পারে না। তবুও অনুপের কাছে এসে বলে,-‘একটু শান্ত হয়ে বস অনুপ। কী হয়েছে তোমার বল আমাকে। আমার যে খুব ভয় করছে।’ 
অনুপ আর কোনও কথা বলে না। দু’বাহুর ভেতরে তনুকে জড়িয়ে নিয়ে পাগলের মতো তনুর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দুটো ভরে দেয়। তখনও অনুপের চোখে ঝরেই চলেছে শ্রাবণের উষ্ণ নোনা জলের ধারা। এভাবে কিছু সময় পেরিয়ে যাবার পর যখন দুজনেই বাস্তবের মাটিতে ফিরে আসে, তনু বলে, -‘তোমার কি হয়েছে বলবে না আমাকে ?’ 
অনুপ তনুকে আরও একটা চুম্বন করে বলে, -‘তোমাকে ছাড়া কাকেই বা বলব ?’ 
-‘তাহলে বল।’ 
অনুপ তনুকে বিছানায় বসিয়ে ওর মাথাটা বুকে নিয়ে বলে, -‘এখন নয় রাত্রিতে অনেক কথা বলব। বিয়ে করার আগে কথাগুলো তোমার জানাও দরকার। সব শোনার পরেও তোমার যদি মনে হয় তুমি আমাকে বিয়ে করতে পারবে তাহলেই…, নতুবা তুমি যা বলবে তাই হবে।’ 
তনু দু’হাতে করে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে অনুপকে, -‘তোমাকে বিয়ে করতে না পারলে হয়তো আমি বেঁচেই থাকব অনুপ, কিন্তু তোমার তনু সত্যি মারা যাবে।’
অনুপ সোহাগে তনুর মাথায় চুমু খেয়ে বলে, -‘জানি না তনু আমি কতটা লোভী তবে এটুকু জানি আমার লোভের কারণ তোমার ভালবাসা ছাড়া দ্বিতীয় কিছু নয়। তবে তোমাকে আমার সম্পর্কে সব না জানিয়ে এখানে আনাটা ঠিক হয়নি। কী জানি হয়তো হারাবার ভয়ে কিছুই বলিনি। আজকে বলব। সব বলব। যদি হারিয়েও ফেলি তাও বলব। আমাকে বলতেই হবে নতুবা শান্তি পাব না।’ 
দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ বসে থাকে। কোনও শব্দ নেই আর। শুধু দুটো হৃদয় সব হারানোর ভয়ে বিপ-বিপ করতে থাকে দেওয়াল ঘড়িটার টিক-টিক শব্দের সাথে। 

অনুপ নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লে তনু ছাদে এসে চাঁদটার দিকে তাকিয়ে আকাশ পাতাল ভাবতে থাকে। কী বলবে আজকে রাতে অনুপ ? এই প্রশ্নটা ঘুরে ফিরে তনুর ভাবনার মেঘগুলোকে টুকরো টুকরো করে দিয়ে যায় বারবার। হাত জোড় করে তনু ভগবান কে বলে, -‘জীবনটা শুরুর আগেই শেষ করে দিও না প্রভু। আমাকে শক্তি দাও আমি যেন অনুপের সব কথা সইতে পারি। সে যতই কোঠর হোক না কেন। হে ঈশ্বর আমি যেন কোনও পরিস্থিতিতেই অনুপের হাত না ছাড়ি।’ 
পিছন থেকে মুক্তা মাসি এসে তনুকে জিজ্ঞেস করেন, -‘মা তোমার শরীর ভালো আছে তো ? সন্ধ্যায় নীচেও এলে না কিছু খাবারও খেলে না। অনুপের সাথে কী কিছু…’ 
-‘না না মাসিমা ওর সাথে আবার কী হবে। বাড়ির জন্য মনটা খারাপ ছিল বিকেল থেকে। তাই আর খেতে ইচ্ছে করল না।’ কথাটা মাসিকে শেষ করতে না দিয়েই উত্তর দেয় তনু। 
মুক্তা মাসি একটু হেসে বলেন, -‘ও তাই, আমি ভাবলাম অনুপের সাথে কিছু...। আচ্ছা মা অনুপ তোমাকে ওর মা বাবা আর আমার ব্যাপারে কী কী বলেছে ?’ 
-‘তেমন কিছুই না। একটা কথা প্রায়েই শুনি মা মারা যাবার পর মুক্তা মাসির কাছেই আমি মানুষ। মন খারাপ হলে দেখেছি চুপচাপ মাকে মনে করে। মা এর চিতায় জল ঢালার মুহূর্তটা এখনও ওর মনে আছে। বাবার কথা কিছুই বলে না। জিজ্ঞেস করলেও এড়িয়ে যায়। এই সবই টুক-টাক কয়েকটা জিনিস জানি বিশেষ কিছুই না।’
-‘ওর মা প্রভাতী ছিল নারী মুক্তি আন্দোলনের খুব বড় নেত্রী। একটা সময় লোকের মুখে মুখে প্রভাতীর নাম ঘুরত। সবাই বলত নতুন যুগের প্রভাতী। যেখানেই নারীর উপর অন্যায় বা অত্যাচার হত সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ত প্রভাতী।’ অবাক ভাবে তনু তাকিয়ে থাকে মাসিমার মুখের দিকে। মুক্তা মাসি বলে যান, -‘অত্যাচারের খবর পেলেই প্রভাতীর চোখে যেন আগুন খেলে যেত। এখনও ওর মুখটা মনে পড়লে ভেতরে একটা সাহস পাই। কত অপরাধী শাস্তি পেয়েছে ওর হাত ধরেই।’ 
অনুপের মা-এর গল্প শুনে তনুর ভেতরেও কোথাও যেন একটা সাহসের বীজ পাতা মেলার জন্য মাথা তুলে দাঁড়ায় মনের মাটিতে। তনু অনুপের বাবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতেই যাচ্ছিল কিন্তু অনুপ চলে আসায় আর সেটা হয়ে উঠল না। 
-‘আচ্ছা তোমরা দুজনে গল্প কর আমি ততোক্ষণে তরকারিটা চাপিয়েদি।’ কথাটা বলেই ছুটে মুক্তা মাসি নীচে চলে যান। 
আগামীকাল দোল পূর্ণিমা। আকাশ জুড়ে যেন রানী সেজে বসেছে চাঁদটা আজকে থেকেই। অনুপ তনুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, -‘তোমার ঠাণ্ডা লাগছে না তনু ? আজকে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে কিন্তু।’ 
তনু ঠোঁটে এক টুকরো হাসির রেখা এঁকে বলে, -‘যার ভেতরে আগুন জ্বলছে সে কী ঠাণ্ডা বাতাসকে ভয় পায়।’ 
তনুর কথায় হাসতে হাসতে অনুপ বলে, -‘আচ্ছা তনু প্রমিথিউস কে ছিলেন জান ?’ 
-‘না তেমন ভাবে জানি না। তবে গল্পে পড়ে ছিলাম মানুষের জন্য আগুন চুরির অপরাধে তার শাস্তি হয়েছিল।’ 
-‘গল্পটা পুরো মনে আছে ?’ 
-‘না পুরো মনে নেই।’ একটু ভেবে উত্তরটা দেয় তনু। 
-‘শুনবে প্রমিথিউসের গল্প ?’ 
বেশ কৌতূহলের সাথেই তনু বলে, -‘শুনব না কেন ? শুনব।’
তনুর কাঁধে হাত রেখে ছাদের আরেক দিকে হাঁটতে হাঁটতে গল্পটা বলতে থাকে অনুপ, -‘প্রমিথিউস। যা লাতিন উচ্চারণে প্রোমেথেউস। গ্রিক পুরাণের দেবতা। তিনি ছিলেন টাইটান দেবতা ইয়াপেতুস ও ওশেনিড ক্লাইমেনের সন্তান। গ্রিক পুরাণ অনুসারে প্রমিথিউস একজন টাইটান বলতেই পার। যাকে বলা হত মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। প্রমিথিউস এবং তার ভাই এপিমেথিউসকে মানুষের জীবন ধারণের সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করার জন্য আদেশ দেয়া হয়েছিল। আদেশ অনুসারে এপিমেথিউস প্রাণীদের সাহস, শক্তি, দ্রুতি এবং পালক, চুল ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলক উপাদান সরবরাহ করেন। কিন্তু যখন প্রাণী কুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের প্রশ্ন উঠল তখন এপিমেথিউস ভাই প্রমিথিউসের সাহায্য চাইতে বাধ্য করা হল। প্রমিথিউস মানুষকে আর সব প্রাণী থেকে শ্রেষ্ঠতর করার জন্য তাদের সোজা হয়ে চলতে শেখালেন এবং অন্যান্য জীব থেকে মানুষকে উন্নতর বলে ঘোষণা করলেন। তারপরেই তিনি নিজে স্বর্গে যান এবং মানুষের জন্য সূর্যের কাছ থেকে মশাল জ্বালিয়ে আনেন। মানুষকে আগুন উপহার দেন। মানুষকে প্রমিথিউসের এই উপহার মেনে নিতে পারেননি দেবতা জিউস। শাস্তি স্বরূপ জিউস প্রমিথিউসকে পাহাড়ের সাথে শৃঙ্খলিত করে রাখেন এবং তার উপর বর্বর অত্যাচার চালান। একটি ঈগল রোজ এসে প্রমিথিউসের কলিজা খেয়ে যেত আর সেখানে জন্ম নিত নতুন আরেকটি কলিজা। আবার ঈগল এসে খেয়ে গেলে নতুন কলিজা জন্মাতো। এভাবেই জিউস তাকে শাস্তি দিতে থাকেন। এখানে আগুন হল বিপ্লব। আগুন হল স্বাধীনতা। যার কখনো মৃত্যু হয় না। সেটাই প্রমেথিউস মানুষকে উপহার দিয়েছিলেন।’
তনু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে ছিল অনুপের মুখের দিকে। গল্পটা বলা শেষ হলে তনু বলে, -‘অনুপ একটা কথা জিজ্ঞেস করব ?’ 
-‘একটা কেন হাজারটা প্রশ্ন করতে পার কিন্তু এখন নয়। রাত বারটার পর। আজ আমি তোমাকে জীবনের অনেক গল্প বলব। তার পরেও যদি কোনও প্রশ্ন থাকে, আজীবন উত্তর দেব তার।’
কথাটা বলার পর অনুপ তনুর কপালে আলতো চুম্বন করে নীচে চলে যায়। তনু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকে লাল-হলুদ আবির রাঙা মেঘের ভেতর চাঁদটা কেমন ভাবে একলা একলা রঙ খেলছে। তনুর ইচ্ছে করে চাঁদটার সাথে হাতে হাত মিলিয়ে আবির খেলতে।
          
।।সাত।।
রাত্রিতে বিশেষ কিছুই খেতে পারেনি তনু। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন একটা তোলপাড় চলছিল। গলা দিয়ে খাবারগুলো নামতেই চাইছিল না। মনে হচ্ছিল যেন এখুনি বমি হয়ে যাবে । আজকে সন্ধ্যা থেকে বাড়ির কথা ভাবার তেমন সময় পায়নি তনু। একবার চাঁদের দিকে একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে তাকিয়েই এক সময় রাত্রি বারটা বাজল। তনু মনের ভেতর ঘরে অবিরাম অভিনীত হয়ে চলা নাটকের সংলাপ গুলোকে আরও একবার ভালো করে ঝালিয়ে নিল। যত সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ততই যেন একটা চাপা উত্তেজনা তনুর বুকের ভেতর থেকে বুদ্বুদের মতো বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। রাত্রি বারটা বেজে সাত-আট মিনিট যখন, তখন অনুপ তনুর ঘরে এসে ঢুকল। পরনে একটা সাদা পাজামা পাঞ্জাবি। মাথায় গৈরিক রঙের পাগড়ি। কপালে লাল আবিরের তিলক। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে শিকারি বাঘের মতো। তনুর মনে হল অনুপ যেন মৃত্যুর মতো সুন্দর। যে রূপ দৈত্য; দানব; দেবতা সবাই কে হার মানায়। 
কোনও রকম ভনিতা না করেই অনুপ শুরু করল তার জীবন দর্শন। তার জীবন কাহিনি -‘আমি প্রভাতী দেবীর এক মাত্র সন্তান অনুপ বসু। ওরফে, উল্কা। তোমার বিশ্বাস না হতেও পারে তবুও এটাই সত্যি আমিই “প্রমিথিউসবাদী”- সংগঠনের প্রাণপুরুষ সুদূর আকাশ থেকে ঠিকরে পড়া একটা জ্বলন্ত উল্কা।’
ভয়ে বিস্ময়ে তনুর রক্ত যেন হিম হয়ে গেল এক মুহূর্তে। সে নিজের কান নিজের চোখ কোনওটাকেই বিশ্বাস করতে পারছে না কিছুতেই। বিশ্বাস করবেই বা কেমন করে দু’বছর ধরে পুলিশ যাকে কুকুরের মতো খুঁজছে। দেশের প্রতিটা ছোট বড় পত্র পত্রিকায় যার গল্প প্রতিদিন। সেই গল্পের নায়ক যে তনুর সামনে দাঁড়িয়ে!
এইতো কদিন আগেই তনুর বাবা খবর কাগজ পড়তে পড়তে ছুটে এসে যে কথাগুলো তনুর মাকে বলেছিলেন সেই কথাগুলো এখনও তনুর পরিষ্কার মনে আছে, -‘সুমি, এই সুমি এদিকে দেখে যাও তালডাংরার সেই ডাকাত চারটা মারা পড়েছে। বেশ হয়েছে শালারা মরেছে। ব্যাটা ডাকাতি করে আবার বাড়ির বৌকে রেপ করা। শালারা কুত্তার মতো মরেছে। বলেছিলাম না উল্কা মরতেই পারে না। ওটা মিথ্যে খবর ছিল। এই তো ছবিটা দেখো চার শালার পিঠেই প্রমিথিউস লেখা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস হরিরামপুরের ওই যৌনখোর পশুটাকেউ প্রমিথিউসবাদী রাই মেরেছে। হয়তো সময় পায়নি পিঠে প্রমিথিউস লেখার। তুমি দেখবে মেয়ে মাংস লোভী সবকটা নেকড়ে একে একে মরবে প্রমিথিউসদের হাতে একদিন।’  
একদিকে যে পুরুষ যুবকের আদর্শ। নারীর সম্মান। বৃদ্ধার ভাঙাবুকে আশার আলো। যার নাম মানেই পূর্ণ স্বাধীনতার নেশা। অথচ আরেক দিকে যাকে দেখতে পেলেই গুলি করে মারার আদেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত। সেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মৃত্যুদণ্ডদাতা ‘উল্কা’ তনুর সামনে জলজ্যান্ত দাঁড়িয়ে! আরও বড় কথা সেই উল্কামানব যাকে সামনে থেকে এখনো দেখেনি কেউ সেই তনুর প্রাণপুরুষ।  
আবার বলতে শুরু করে উল্কা, -‘আমার বা আমার সংগঠনের একটাই বিধান, অন্ধকারের দমন। এই ক্ষমতার হাতবদলকে আমরা স্বাধীনতা বলে মানি না। আমরা চাই সবার বাস্তবিক সমান অধিকার। মৌখিক বা লিখিত অধিকার নয়। আমরা চাই একটা শিশুও যেন এক বেলাও অভুক্ত না থাকে। একটা মানুষও যেন ঘরের অভাবে রাস্তায় রাত না কাটায়। আমরা চাই প্রতিটি মেয়ের আত্মরক্ষার জন্য শারীরিক প্রশিক্ষণের পূর্ণ ব্যবস্থা। প্রতিটি বেকারের কর্ম-সংস্থান। চামড়া পাল্টে পাল্টে আসা নেতাদের হাতে নয়, আমরা চাই প্রতিটি মানুষের হাতে ক্ষমতার বণ্টন। আমরা চাই প্রতিটি ভ্রূণের নিরাপত্তা। আমরা চাই প্রতিটি নোংরা ওয়েব সাইটের ধ্বংস। আমরা চাই প্রতিটি ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড। আমরা চাই বিপ্লব। আমরা চাই প্রমিথিউস। এবার তুমি তোমার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে পার।’ অনুপ ওরফে উল্কার বজ্রকণ্ঠ শোনার পর তনু ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করে, -‘অপরাধীকে তার অপরাধের শাস্তি বা বিচার দেবে কে ? প্রশাসক, আইন, কানুন সব তো অন্ধ। সব তো অর্থের দাস।’ 
-‘বিচার ব্যবস্থা অন্ধ হলেও জনগণ অন্ধ হয়ে যায় না। তুমিই বিচারক তুমিই দণ্ডদাতা তুমিই প্রমিথিউস। তুমি সজাগ হলেই হল। আমি যদি আমার খুনি ধর্ষক পিতাকে শাস্তি দিতে পারি তোমরা কেন পারবে না ? তুমি শুধু তোমার হাত বাড়াও দেখবে শত শত হাত তোমাকে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে প্রমিথিউসের পথে।’ 
-‘তুমি তোমার বাবাকে কী শাস্তি দিয়েছিলে অনুপ ?’
-‘না অনুপরা শাস্তি দিতে পারে না তনু। অনুপরা শুধু মোমবাতি মিছিলে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়াতে পারে। শাস্তি দিয়েছে উল্কা। বাবাকে নয়, একজন খুনি ধর্ষক নেকড়েকে।’ 
ভয়ে ভয়ে তনু জানতে চায়, -‘তোমার বাবা কাকে খুন বা ধর্ষণ করেছিলেন যার শাস্তি দিয়েছিলে তুমি ?’
এবার উল্কার চোখ চিরে অনুপের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোটা। উল্কার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুপ বলতে থাকে সেই কাহিনি, -‘সেদিন সন্ধ্যায় মা মুক্তা মাসির সাথে একটা দরকারি কাজে একটু বাইরে গিয়েছিল। আমি পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। নীচে রান্না ঘরে খাবার করছিল বাড়ির কাজের মেয়ে ছায়া পিসি। সেই সুযোগে শয়তান ছায়া পিসিকে আক্রমণ করে। বেচারির কিছুই করার ছিল না নির্মম ভাবে ধর্ষণ হওয়া ছাড়া। কিন্তু ঠিক তখনই মা আর মুক্তা মাসি এসে পড়ে। আর এসেই দেখে এক বীভৎস দৃশ্য। মা তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ফোন করতেই যাচ্ছিল। পারেনি ফোন করতে। শয়তানটা মায়ের কণ্ঠ নালী কেটে দিয়েছিল ফলকাটা ছুরি দিয়ে। তখন যে আমিও জেগে গেছি। আমার সামনেই মায়ের মৃত্যু হয়েছিল সেদিন। মাকে কথা দেওয়ার জন্যই মুক্তা মাসি আজও যেতে পারেনি আমাকে একলা ফেলে।’ 
এবার কান্নায় ভেঙে পড়ে অনুপ। এমন মুহূর্তে তনুও সাহস পায়না অনুপের কাছে এসে সান্ত্বনা দিতে। কিছুক্ষণের ভেতর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে অনুপ-‘সেদিন থেকেই আমার প্রমিথিউসের পথে চলা শুরু। এরপর যেদিন ঐ শয়তানটা মুক্তা মাসিকে ধর্ষণ করার চেষ্টা করে সেই দিন আমি ওর টুঁটি ছিঁড়ে নামিয়ে দিয়ে ছিলাম।’ শেষ দিকের কথাগুলো বলতে গিয়েই অনুপের সজল চোখ আবার হারিয়ে যায় উল্কার দাউ দাউ আগুনে, -‘জান তনু পুলিশের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে সবাই যদি অপরাধের শাস্তি দিতে এগিয়ে আসে তাহলে একদিন আর শাস্তি ব্যবস্থার দরকার পড়বে না। দরকার পড়বে না কোনও উল্কার। সবাই সেদিন প্রমিথিউস। সবার হাতের মশালেই জ্বলবে আগুন।’
তনুর ভেতরে যখন ভয় নামের ভোরটা কেটে যাচ্ছিল এক শক্তিমান সূর্যোদয়ের নতুন আলোয় তখন সে সাহস পেয়েছিল প্রশ্নটা করতে, -‘তোমাকে দেখতে পেলেই গুলি করে মারার আদেশ। তোমার ভয় করে না অনুপ ?’ 
হাসি মুখে অনুপ বলেছিল, -‘যতবার মৃত্যু হবে আমার, হৃৎপিণ্ড পাল্টে পাল্টে ততবারেই প্রমিথিউসের মতোই ফিরে ফিরে আসব আমি। আমি যে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে আছি তনু। মানুষের ভালবাসার মৃতসঞ্জীবনী আমার বুক পকেটে রাখা আছে।’ 
আর কথা বাড়ায়নি তনু। শুধু প্রণাম করে আশীর্বাদ চেয়ে বলে, -‘আশীর্বাদ কর যেন তোমার কুরুক্ষেত্রে নির্ভীক সৈন্য হতে পারি।’ 
রাতে আর ঘুম আসেনি তনুর। সারা রাত শুয়ে শুয়ে খুঁজেছিল হাজার প্রশ্নের উত্তর। যার চোখে এত ভালোবাসা। এত করুণা। এত জল। সেই চোখেই কীভাবে জ্বলে উল্কার আগুন ? হিসেব মেলেনি তনুর। হয়তো একদিন প্রমিথিউসের পথে চলতে চলতে অনিবার্য অভিযোজনে তনুর চোখেও জ্বলবে আগুন। আর সেদিন আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে,-‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরুপেন সংস্থিতা, নমস্তসৈ নমস্তসৈ নমোঃ নমোঃ'
দোলপূর্ণিমার সকালে তনু ওর বাবাকে দুলাইনের একটা চিঠি লিখল, -‘বাবা পারলে তোমরা আমায় ক্ষমা করে দিও। আমি উল্কার জীবনসঙ্গিনী হয়ে প্রমিথিউসের পথে পা বাড়ালাম। আশীর্বাদ করো যেন আজীবন প্রমিথিউসের পথে চলে বিপ্লব আনতে পারি।’
                          [সমাপ্ত]

হঠাৎ বৃষ্টি

হঠাৎ বৃষ্টি বাপ্পাদিত্য মুখোপাধ্যায় এখানের বৃষ্টির ফোঁটাগুলোও যেন প্রাণে ভরপুর। গাছের সবুজ পাতায় ঝাঁপিয়ে পড়ার পরই হাওয়ার তরঙ্গে ...